g সাগরের রোহিঙ্গাদের নিয়ে মিয়ানমারের গণমাধ্যম নীরব | AmaderBrahmanbaria.Com – আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া

রবিবার, ১২ই নভেম্বর, ২০১৭ ইং ২৮শে কার্তিক, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

সাগরের রোহিঙ্গাদের নিয়ে মিয়ানমারের গণমাধ্যম নীরব

AmaderBrahmanbaria.COM
মে ২১, ২০১৫
news-image

---

সাগরে ভাসমান রোহিঙ্গাদের বিষয়ে গত একমাসে মিয়ানমারের জাতীয় ও স্থানীয় কোনো সংবাদ মাধ্যমে এক কলমও লেখা হয়নি।  রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনো মানবিক এবং পুশব্যাক তথ্য প্রচার না করতে গণমাধ্যমকে দেশটির সরকার কঠোর হুঁশিয়ারি করে দিয়েছে এর আগেই। মিয়ানমারের একজন গণমাধ্যমকর্মী এই প্রতিবেদককে জানান, গত ১০ বছর ধরে মিয়ানমারের পত্রিকাগুলো রোহিঙ্গাদের ইস্যুতে বাংলাদেশ বা আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থার বিবৃতি বা সংবাদ প্রকাশ করেনা।

তিনি আরো জানান, অনলাইন নিউজ পোর্টাল বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে কেউ যদি সরকারের নিষেধাজ্ঞা না মেনে কোনো তথ্য প্রচার করে তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়। ২০১২ সালে একজন মানবাধিকারকর্মী এ বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে যোগাযোগ করায় তাকে কারাবরণ করতে হয়।

গত একমাস ধরে সাগরে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি অভিবাসীদের নিয়ে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলো এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে সাগরে ভাসমানদের আশ্রয় দেয়ার অনুরোধ ও চাপ দেয়া হচ্ছিলো। অব্যাহত সেই চাপের ফলেই গত বুধবার ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড সাগরে ভাসমান অভিবাসীদের আশ্রয় দেয়ার সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত করেছে।

এক সপ্তাহ (১৪-২০ মে, ২০১৫) ধরে প্রকাশিত দ্য গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমার ইন্টারনেট সূত্রে দেখাগেছে। দেশটির তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত ও প্রাচীনতম দৈনিক সংবাদপত্র নিউ লাইট অব মিয়ানমার-এর ইংরেজি ও বৈশ্বিক সংস্করণ এটি। ওই গণমাধ্যমকর্মী বলেন, সংবাদপত্রটি সেখানকার সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক; এটি প্রায় সব নাগরিকই পড়ে থাকেন, কারণ এই পত্রিকাটি বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। তাও কোনোভাবেই এই পত্রিকাটি দেশের বাইরে পাঠানোর সুযোগ নেই।

জানা গেছে, প্রিন্ট ভার্সান পত্রিকাগুলো ছাপানোর আগে সেন্সর করা হয় এবং অনলাইনে আরো কঠোর সেন্সর চলে। তারা  মনে করে, দেশের ইংরেজি পাঠকের উপযোগী সব সংবাদ ও বিশ্লেষণ দেশের বাইরের পাঠকদের জন্য জরুরি নয়। সে ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা হচ্ছে এর পিডিএফ ফরমেট পড়া। সেটাও অবশ্য জটিল ও যথাসম্ভব পাঠকবৈরী প্রক্রিয়া। তবুও অনেকটা ধরাধরি করে ১৬ পৃষ্ঠার এই ট্যাবলয়েড সাইজ সংবাদপত্রের সাত দিনের সংখ্যা দেখছিলাম এই উদ্দেশ্যে যে; বাংলাদেশ থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত পাঁচ সহস্রাধিক কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় চলতি মাসের গোড়া থেকে মানব পাচার ও অবৈধ সমুদ্রযাত্রার কারণে যে মানবিক বিপর্যয় ঘটে চলেছে, মিয়ানমারের সংবাদপত্রে তা কতখানি প্রতিফলিত হয়েছে।

গত ১৮ মের পত্রিকায় রয়েছে, মিস গোল্ডেন ল্যান্ড মিয়ানমার প্রতিযোগিতা কিংবা শিল্প প্রদর্শনীর সংবাদ রয়েছে কোনো কোনো পৃষ্ঠার বহুলাংশজুড়ে।  কিন্তু উপকূলে উপকূলে কীভাবে নারী ও শিশু আশ্রয়ের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তার খবর নেই। সার্বিয়া সফরে থাকা মিয়ানমারের কমান্ডার ইন চিফ মিন অং লাইং প্রতিদিন কোথায় কোথায় যাচ্ছেন, কী করছেন, তার পুঙখানুপুঙ্খ বিবরণ পরিবেশিত হচ্ছে প্রায় পৃষ্ঠাজুড়ে। কিন্তু ওই দেশেরই হাজার হাজার নাগরিক বিদেশের সমুদ্র ও ডাঙা এলাকায় কী পরিস্থিতিতে রয়েছে, তা জানার উপায় নেই সংবাদপত্রটি পড়ে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র কম্বোডিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে নির্মিত একটি চক্ষু চিকিৎসা কেন্দ্র উদ্বোধনের খবরও বেশ বগ করে ছাপা হয়েছে।  কিন্তু অপর প্রতিবেশী থাইল্যান্ডে কীভাবে গণকবর ও গণবুভূক্ষা আবিষ্কৃত হচ্ছে, তা ওই সংবাদপত্র চোখ ফিরিয়েও দেখছে না। এমন নয় যে, পজিটিভ সংবাদ দিতে গিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর দুর্ঘটনাজনক সংবাদ এড়িয়ে চলার সম্পাদকীয় নীতি গ্রহণ করেছে।

জানা গেছে, চট্টগ্রামে সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বন্ত হয়ে তিনজন আহত বা সিলেটে ব্লগার হত্যার খবর রয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অনির্ধারিত বুলেটে একজনের মৃত্যুর খবর রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় ফরাসি নাগরিকের বিচারের খবর রয়েছে।  শুধু সাগরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর শতশত যাত্রী নিয়ে ট্রলারডুবির খবর নেই। নেপালের ভূমিকম্প-দুর্গতদের দুর্দশা নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই মানবিক সংবাদ ছাপা হচ্ছে; কিন্তু সাগরে যারা মানবেতর জীবন যাপন করছে, তাদের জন্য কোনো অক্ষর বরাদ্দ নেই।

জাতিসংঘ মহাসচিবের বিভিন্ন তৎপরতার খবর থাকলেও সমুদ্রে বিপন্ন জনগোষ্ঠী সংক্রান্ত তার উদ্বেগ ও আহ্বানগুলো একেবারেই স্থান পায়নি।

এটা তো মিয়ানমারের সরকারি সংবাদপত্রের চিত্র। বেসরকারিগুলোও কঠোর মনিটরিং এ চলে। মিয়ানমারের ভেতর থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক দ্য মিয়ানমার টাইমস এবং নির্বাসিত পাক্ষিক ম্যাগাজিন দ্য ইরাবতী’র অনলাইন সংস্করণেও নিজস্ব কোনো প্রতিবেদন নেই। এই সংবাদপত্রগুলো যদিও সাগরে শত শত মানুষের দুর্গতির সচিত্র সংবাদ ছাপছিল, তার প্রায় সবই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা পরিবেশিত। সেগুলোও আবার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বা মিয়ানমারের সঙ্গে কোনো যোগসূত্র রয়েছে তেমন বরাত দিয়ে লেখা জয়নি।  সেগুলোতে মূলত থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ঠুরতা চিত্রিত হয়েছে। যারা দুর্গতির শিকার, তাদেরও ঢালাওভাবে বোট পিপল বলা হয়েছে। কোথাও কোথাও পরিচয় যখন অনিবার্য, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা শব্দটি যথাসাধ্য এড়ানো হয়েছে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের নাগরিক। প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে জানা না থাকলে কোনো পাঠকের মনে হতে পারে, যেন সেখানে বাংলাদেশি নাগরিকই রয়েছে।  দ্য ইরাবতী এ বিষয়ে সংবাদ ছাড়া কোনো বিশ্লেষণ বা সম্পাদকীয় প্রকাশ করেনি। অন্যদিকে মিয়ানমার টাইমস একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে ১৫ মে। হোয়াট আর দ্য ফোর্সেস ড্রাইভিং মাইগ্রেশন? শীর্ষক ওই সম্পাদকীয়তেও বলা হয়েছে যে যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ করছে (অভিযোগ শব্দটি লক্ষণীয়), রাখাইন স্টেটে অর্থনৈতিক সুযোগের ঘাটতিও বড় বিষয়।

১৮ মে মিয়ানমার টাইমসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনামসূত্রে জানা গিয়েছিল মিয়ানমার হিটস ব্যাক অ্যাট ইন্টারন্যাশনাল প্রেশার। দেশটির প্রেসিডেন্টের দপ্তরের একজন পরিচালকের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিলে থাইল্যান্ডও সমস্যাটিকে মিয়ানমারের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তার অভিযোগ, এই সমস্যার মূল কারণ আসলে মানব পাচার এবং এর সঙ্গে বরং ওই দুই দেশেরই দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা জড়িত, যারা অভিবাসী শ্রমিকদের অসহায়ত্ব থেকে সুবিধা নিতে চায়।

পাশাপাশি মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম ও সরকারের পক্ষে সমুদ্র-দুর্গতদের বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টাও চলতে থাকে।  ২০ মে দ্য গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমার প্রথমবারের মতো সমুদ্র-দুর্গতদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বাংলাদেশি বোট পিপল রিপেট্রিয়েট শিরোনামের দর্শনীয় ‘বক্স কলাম’ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রাখাইন স্টেটের সিত্তয়ে বন্দরের কাছ থেকে মালয়েশিয়াগামী একদল বাংলাদেশি নাগরিককে কর্তৃপক্ষ ফিরিয়ে দিয়েছে!

অবশ্য পরে যখন আন্তর্জাতিক চাপ আরও বেড়েছে এবং এত বড় মানবিক বিপর্যয় নিয়ে মিয়ানমারের নির্লিপ্ততার দিকেই সবাই অভিযোগের তর্জনী তুলতে শুরু করেছে। ১৮ মে ইয়াঙ্গুনে এক সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র ইউ ইয়ে তুত বলেন, মিয়ানমার সরকার ‘চলমান বোট পিপল সংকট মোকাবেলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার অঙ্গীকার করছে। তবে তিনিও বলেন, এর মূল কারণ মানব পাচার। এখন মিয়ানমার সরকার  যাচাই-বাছাই করে দেখবে, সাগরে ভাসমানদের মধ্যে যারা নাগরিকত্বের প্রমাণ দেখাতে পারবে, মিয়ানমার কেবল তাদেরই ফিরিয়ে নেবে। ২০ মে গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমারের প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয় দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিবৃতি, মিয়ানমারস ভিউ অ্যান্ড এফোর্ট অন মাইগ্রেন্টস অ্যান্ড বোট পিপল (অভিবাসী ও নৌকা-ভাসাদের নিয়ে মিয়ানমারের দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্যোগ)। এতে কঠিন ভাষায় পাঁচটি দফায় যা বলা হয়, সাগরে ভাসমান মানুষ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো সরকারের নজরে এসেছে। তারা আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগের সঙ্গে একমত ও এই ব্যাপারে ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে। নিরীহ মানুষের দুর্গতির কারণ অবৈধ সমুদ্রযাত্রা ও মানব পাচার। পাচার বন্ধে মিয়ানমার আন্তরিক পদক্ষেপ নিচ্ছে ইত্যাদি।

মিয়ানমারের ওই গণমাধ্যম কর্মী জানান, মিয়ানমারের সরকার ও সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য ও ভঙ্গিতে এটা পরিষ্কার, হাজার হাজার মানুষের কান্নায় যখন ভারত মহাসাগর অঞ্চল ভারি হয়ে আছে। যখন ফিলিপাইন কোনোভাবেই এর অংশ না হয়েও তাদের আশ্রয় দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, যখন ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া সাত হাজার অভিবাসীকে আপাতত আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দিতে চেয়েছে; যখন বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ড এই ইস্যুতে যথাসাধ্য চেষ্টা করছে; তখনও মিয়ানমারের মন ভেজেনি।

 

এ জাতীয় আরও খবর