৫ই নভেম্বর, ২০১৬ ইং, শনিবার ২১শে কার্তিক, ১৪২৩ বঙ্গাব্দ
পূর্ববর্তী প্রবাসীদের সেবায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের নতুন যাত্রা, প্রবাসী কল্যাণে হোক শুভ স্মারক- আল আমীন শাহীন


ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হামলা: আড়ালে কেউ কলকাঠি নাড়ছে না তো?


Amaderbrahmanbaria.com : - ০২.১১.২০১৬


শান্তনু চৌধুরী
বর্তমান সরকার টানা প্রায় আট বছর ক্ষমতায়। এ সময়কালে বিভিন্ন কঠিন মুহূর্ত পার করতে হয়েছে দেশকে, যার সর্বশেষ সংযোজন জঙ্গিবাদ। এরপরও বলা যায়, বর্তমান সরকারপ্রধানের দৃঢ়তার কারণে সব ঘটনায় সামাল দেওয়া গেছে। দেশের মানুষ আপাত শান্তিতে আছে। ছোটখাটো ঘটনা বা দুর্ঘটনা ছাড়া দেশ খারাপ চলছে, এ কথা নিন্দুকরাও বলতে পারবে না। বর্তমান সরকারের সময় বাংলাদেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। কয়েক বছর ধরে প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপরে। জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমনে সরকারের আন্তরিকতা দেশের বাইরেও সুনাম কুড়িয়েছে। কিছুদিন আগেও আওয়ামী লীগের সম্মেলনে শেখ হাসিনা কোথায় কে গৃহহীন আছে, তাদের তালিকা করতে বলেছেন। ঘর বানিয়ে দেওয়া হবে। চীনের প্রেসিডেন্ট এসে জানিয়ে গেলেন অকুণ্ঠ সমর্থন। ২৭টি চুক্তি হলো। যেখানে চীন থাকে, সেখানে ভারত থাকে না—এমন কথা প্রচলিত আছে। অথচ চীনের পাশাপাশি ভারতও আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ হিসেবে নানা সাহায্য-সহযোগিতা করে যাচ্ছে।

পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের অবস্থান যে ভুল ছিল, সেটা তারা নিজেরাই স্বীকার করেছে। একই সঙ্গে কিছুদিন আগে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট এসে প্রশংসা করে গেছেন বাংলাদেশের। দারিদ্র্য দূরীকরণে বাংলাদেশ থেকে শিক্ষা নিতে বলেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি প্রশংসা করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের। রাশিয়ার সঙ্গেও বাংলাদেশের বিভিন্ন চুক্তি সই হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে সমুদ্র বিজয় সম্ভব হয়েছে। কেউ কখনো হয়তো ভাবতেই পারেনি পাকিস্তানিদের দোসর রাজাকারদের বিচার এ দেশের মাটিতে হবে। বিশেষ করে তারা যেভাবে শিকড় গেড়ে বসেছিল, যেভাবে নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়ে সমাজের উচ্চ আসনে জায়গা করে নিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তাদের টেনে নামিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধারা এখন সম্মান পাচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। দেশ-বিদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব প্রশংসা কুড়িয়েছে। এর ফলে তিনি অনেক আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন, যার সর্বশেষ সংযোজন ‘চ্যাম্পিয়ন অব দি আর্থ’, যা দেশের জন্য সুনাম বয়ে এনেছে।

এই যে এত এত অর্জন, এসব নিশ্চয় কারো না কারো কাছে চক্ষুশূল হয়ে উঠছে দিন দিন। তাই তারা এসব অর্জনকে ম্লান করতে উঠেপড়ে লেগেছে। হলি আর্টিজানের মতো ঘটনা ঘটিয়ে তারা প্রমাণ করতে চেয়েছে, এ দেশে বিদেশিরা নিরাপদ না, তারা যেন ব্যবসা গুটিয়ে নেয়। এমন কত ঘটনাই তো ঘটছে। কিন্তু দীপাবলি বা কালীপূজার সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে যে ঘটনা ঘটেছে, তা যেন অনেক অর্জনকে ম্লান করে দিয়েছে। হিন্দুদের বাড়িঘর ভাঙচুর করা হলো, মন্দির-মূর্তি ভেঙে ফেলা হলো। কারা করেছে এসব? হেফাজতে ইসলাম আর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের ব্যানারে যারা সমাবেশ করেছে, তারা। রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে সমাবেশ, সেখানে একটা প্ল্যাকার্ডে লেখা ‘কুত্তার বাচ্চা রসরাজ দাস’। এটা এক টিভি চ্যানেলেও দেখানো হয়েছে। এর চেয়েও ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক কথা নিয়ে লেখা হয়েছে অনেক কিছু।

এর আগে পূজা নামের একজনকে ধর্ষণ করা হলো, বাগেরহাটে সংখ্যালঘু এক গৃহবধূকে আটকে রেখে টানা ১৫ দিন নির্যাতন চালানো হলো। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এমন সংখ্যালঘু নির্যাতনের কত খবরই তো আসে। কিন্তু ছড়িয়ে পড়বে বলে অনেক সময় প্রকাশ করা হয় না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘটনার কারণ হিসেবে দেখানো হলো, কাবা শরিফকে নিয়ে ফেসবুকে কথিত ‘ইসলাম অবমাননাকর’ পোস্ট। একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে রামুর বৌদ্ধবিহারে। সেই পোস্ট আমি দেখিনি, তাই জানি না সেই অনুভূতি কেমন? আর কী হলে সেটাতে আঘাত লাগে? তবে এটা নিশ্চিত, এতগুলো মানুষ যে হামলায় অংশ নিয়েছে, তাদের বেশির ভাগই সেই পোস্ট দেখেনি। শুধু শুনেছে। অথবা এর মধ্যে কেউ না কেউ উসকানি দিয়েছে ‘ইসলাম অবমাননা’ হয়েছে বলে। কিন্তু কথা হচ্ছে, এই যে ঘটনাগুলো ঘটল, সে সময় প্রশাসন কোথায় ছিল?

এখন জেলা প্রশাসন, পুলিশ, র‌্যাব ও জনপ্রতিনিধিরা একজন আরেকজনের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। এমনকি তদন্ত কমিটিও যখন সাক্ষ্য নিতে গেল, তখন বিভিন্ন পক্ষ বাহাসে জড়িয়ে পড়ল। অথচ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সমাবেশের ঘোষণা দেওয়ার পর প্রশাসনের সবচেয়ে বেশি সচেতন থাকা উচিত ছিল। কারণ, সেখানে নিকট অতীতে উপমহাদেশের শাস্ত্রীয়সংগীতের কিংবদন্তি ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিধন্য সংগীতভবনে ভাঙচুর হয়েছে।

দুর্গাপূজার ছুটিতে এবার বাড়িতে গিয়ে বেশ মজার একটা বিষয় খেয়াল করলাম। আগে যারা জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল, এরাই এখন এলাকার আওয়ামী লীগের নেতা সেজে হোমড়াচোমড়া হয়ে উঠেছে। অনেকে এদের নাম দিয়েছে ‘হাইব্রিড নেতা’। এদের সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক করেছিলেন। আওয়ামী লীগের সম্মেলনে তিনি নেতাদের বলেছেন, সামনে ভোট, মানুষের বাড়ি বাড়ি যেতে। তাহলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যে এত বড় ঘটনা ঘটল, সে এলাকায় বাধা দেওয়ার মতো কি কোনো আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ছিল না? নাকি তারাও চাইছে, এ দেশ থেকে সংখ্যালঘুরা বিতাড়িত হোক, তাহলে তাদের সম্পত্তি দখলে নিতে সুবিধা হবে। তাহলে বুঝতে হবে, সরকারের এত এত অর্জনকে ম্লান করতে চাইছে কোনো না কোনো পক্ষ। একাত্তরের পরাজিত শক্তি, তাদের দোসর থেকে শুরু করে অনেকে এখনো ঘাপটি মেরে আছে ক্ষমতাসীন দল থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে। তাদের পূর্বতনরা যেমন এ দেশ চায়নি, তেমনি তারাও চায় শেখ হাসিনার অর্জন ম্লান হোক, দেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ হোক। তাই খুঁজে বের করতে হবে, আড়ালে কে কলকাঠি নাড়ছে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে এসব ঘটনার বিচার। কারণ, নিকট অতীতে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোনো বিচার হয়েছে বলে মনে পড়ে না।
শান্তনু চৌধুরী : লেখক ও সাংবাদিক





Loading...


প্রকাশকঃ মোঃ আশ্রাফুর রহমান রাসেল
সম্পাদক : বিশ্বজিত পাল বাবু
চেয়ারম্যান : আলহাজ্ব নুরুজ্জামান
ঠিকানা : ৬০৩ ফুলবাড়িয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
email : [email protected] (news)
Phone: +880851 62307
+8801963094563


close