রবিবার, ২৯শে জুলাই, ২০১৮ ইং ১৪ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

আজ মহালয়া এলো দেবীপক্ষ

news-image

আশ্বিনি পা! প্রকৃতির গা জুড়ে শরত্। শরতের বাতাসে এখন যেন মন্দ্রিত হচ্ছে ‘রূপংদেহি, জয়ংদেহি, যশোদেহি, দ্বিষোজহি’র বিন্দাস সুর। হাওয়ায় এখন পূজা পূজা গন্ধ। উমাময় ঠাকুরঘর। এল শাস্ত্রীয় দেবীপক্ষ। দক্ষিণায়নের দিন। শরতের মেঘ আনাগোনা করলেও আকাশে মাঝে মাঝেই বর্ষার ঘনঘটা। তারই মধ্যে সেজে উঠছে মণ্ডপগুলো। কৈলাশ শিখর থেকে তার আগমনী বার্তায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঘরে ঘরে উত্সবের রোশনাই। কণ্ঠে আবাহন—‘এসো গো শারদলক্ষ্মী, তোমার শুভ্র মেঘের রথে, এসো নির্মল নীলপথে, এসো ধৌত শ্যামল আলো-ঝলমল-বনগিরিপর্বতে/এসো মুকুটে পরিয়া শ্বেতশতদল শীতল-শিশির ঢালা…।
 
সনাতন হিন্দু বিশ্বাসে— দশভুজা শক্তিরূপেণ দুর্গা মণ্ডপে মণ্ডপে অধিষ্ঠান করবেন। শেফালি ঝরা শারদ প্রভাতে জলদকণ্ঠে চণ্ডীপাঠ আর পিতৃপক্ষের তর্পণের সমাপন ঘটবে। আজ সোমবার চণ্ডীপাঠের মাধ্যমে মর্ত্যলোকে আমন্ত্রণ জানানো হবে দেবী দুর্গাকে। অতঃপর ঘনঘটার অমাবস্যা তিথিতে প্রাণে দ্যোতনা তুলে ঢাকে পড়বে কাঠি। 
আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষের নাম মহালয়া। হিন্দু পুরাণে আছে: সৌর উত্তরায়ণকালে বিষ্ণুলোকে যখন দিন, যমলোকে তখন রাত-দক্ষিণায়ন। উত্তরায়ণের ছ’ মাস দেবতারা জেগে থাকেন, বিষ্ণুলোকের তোরণ থাকে অবারিত। দক্ষিণায়নের ছ’ মাস দেবতারা নিদ্রিত। কিন্তু যমলোকে দিনমান, দুয়ার খোলা। দক্ষিণায়নের পয়লা দিনে ঘুম ভেঙে জেগে উঠেই বন্ধ দুয়ার ঠেলে পিতৃপুরুষেরা ছুটে আসবেন মর্ত্যলোকে। এ সময় তারা থাকেন ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর। উত্তরপুরুষদের হাতে একটু শ্রাদ্ধাহার পেলেই তারা পরম তৃপ্ত। সে অর্থে মহালয়া মর্ত্যলোকে পরলোকগত পিতৃগণের একত্র ক্ষণিক আবাস। দুর্গোত্সবের তিন পর্ব: মহালয়া, বোধন আর সন্ধিপূজা। মহালয়ায় পিতৃপক্ষ সাঙ্গ করে দেবীপক্ষের দিকে যাত্রা শুরু হয়।
 
১৮ অক্টোবর সায়ংকালে অকাল বোধনে খুলে যাবে মা দুর্গার চোখের পলক। ধূপের ধোঁয়ায় ঢাক-ঢোলক, কাঁসর-মন্দিরার চারপাশ কাঁপানো নিনাদ আর পুরোহিতের ভক্তিকণ্ঠে: ‘যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা/নমস্তৈস্য নমস্তৈস্য নমো নম…’ মন্ত্রোচ্চারণের ভিতর দূর কৈলাশ ছেড়ে দেবী পিতৃগৃহে আসবেন।
 
হিন্দু সংস্কৃতি বিধানে— আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে এবং চৈত্রমাসের শুক্লপক্ষে দুর্গোত্সব পালন করা যায়। চৈত্র অর্থাত্ বসন্তকালের দুর্গাপূজা বাসন্তী দুর্গাপূজা ও আশ্বিন অর্থাত্ শরত্কালের দুর্গাপূজা শারদীয়া দুর্গাপূজা নামে পরিচিত। দূর্গাপূজার প্রচলন নিয়ে হিন্দু পুরাণ ঘেঁটে জানা যায়, ভারতের দ্রাবিড় সভ্যতায় মাতৃতান্ত্রিক দ্রাবিড় জাতির মধ্যে মাতৃদেবীর পূজার প্রচলন ছিল। সিন্ধু সভ্যতায় (হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতা) দেবীমাতার, ত্রিমস্তক দেবতা, পশুপতি শিবের পূজার প্রচলন ছিল। দুর্গা শিবের অর্ধাঙ্গিনী—সে হিসাবে অথবা দেবীমাতা হিসাবে পূজা হতে পারে। তবে কৃত্তিবাসের রামায়ণে আছে, শ্রী রামচন্দ্র কালিদহ সাগর থেকে ১০১টি নীলপদ্ম সংগ্রহ করে সাগরকূলে বসে বসন্তকালে সীতা উদ্ধারের জন্য সর্বপ্রথম শক্তি তথা দুর্গোত্সবের আয়োজন করেছিলেন। মারকেন্দীয়া পুরাণ  মতে, চেদী রাজবংশের রাজা সুরাথা খ্রিষ্টের জন্মের ৩০০ বছর আগে কলিঙ্গে (বর্তমানে উড়িষ্যা) ‘দুশেহিরা’ নামে দুর্গাপূজা প্রচলন করেছিলেন। মধ্য যুগে বাংলা সাহিত্যে দুর্গাপূজার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ১১ শতকে অভিনির্ণয়-এ, মৈথিলী কবি বিদ্যাপতির ‘দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী’তে দুর্গাবন্দনা পাওয়া যায়। বঙ্গে ১৪ শতকে দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল কিনা ভালোভাবে জানা যায় না। ১৫১০ সালে কুচ বংশের রাজা বিশ্ব সিংহ কুচবিহারে দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। আধুনিক দুর্গাপূজার প্রাথমিক ধাপ অষ্টাদশ শতকে নানা বাদ্যযন্ত্র প্রয়োগে ব্যক্তিগত, বিশেষ করে জমিদার, বড় ব্যবসাযী, রাজকর্মচারী পর্যায়ে প্রচলন ছিল। পাটনাতে ১৮০৯ সালের দুর্গাপূজার তৈলচিত্রের ডকুমেন্ট পাওয়া গেছে। উড়িষ্যার রামেশ্বরপুরে ৪০০শ বছর ধরে সম্রাট আকবরের আমল থেকে দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। বার ইয়ার বা বারোয়ারী পূজা প্রথম হুগলীর গুপ্তিপাড়ার ১২ জন বন্ধু মিলে ১৭৬১ সালে আয়োজন করেছিলেন। সম্ভবত সেই থেকে বারোয়ারী পূজা শুরু।
 
বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উত্সব শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে রাজধানীসহ সারাদেশে উত্সবের আমেজ শুরু হয়েছে। দেশে প্রতিবছর পূজামণ্ডপের সংখ্যা বাড়ছে। এ বছরও বাড়ছে প্রায় ৫শ পূজামণ্ডপ। ঢাকেশ্বরী মন্দিরে এবারের আয়োজনের মধ্যে রয়েছে ১৮ অক্টোবর বেদীর ষষ্ঠাদি কল্পারম্ভ, ১৯ অক্টোবর সপ্তমীতে সকালে মহাসপ্তমী পূজা, সন্ধিপূজা, ২০ অক্টোবর সকালে দেবীর মহাষ্টমী পূজা আরম্ভ, রাত ১১টা থেকে ১১টা ৫২ মিনিটে সন্ধিপূজা, ২১ অক্টোবর পূর্বাহ্নে দেবীর মহানবমী পূজা সমাপন ও ২২ অক্টোবর সকাল ৯টা ৫৩ মিনিটে দশমী পূজা আরম্ভ এবং সকাল ১০টা ৫১ মিনিটে পূজা সমাপন ও রাতে প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোত্সব শেষ হবে ।
 
এ বছর সারাদেশে সাড়ে ২৮ হাজার থেকে ২৯ হাজার মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করছেন পূজা উদ্যাপন পরিষদের নেতারা।