সোমবার, ১৬ই জুলাই, ২০১৮ ইং ১লা শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

‘বোনরে…ভালো থাকিস’

জেরিন তাসনিম রাফা। মেধাবী এই মেডিকেল শিক্ষার্থী বাঁচানোর জন্য চিকিৎসক সমাজের অভূতপূর্ব চেষ্টা আর ভালোবাসার পাশাপাশি প্রতি মুহূর্তেই ফেসবুকজুড়ে চলে নানান আকুতি। কিন্তু সবাইকে কাঁদিয়ে বৃহস্পতিবার ভোররাতে না ফেরার দেশে চলে গেছেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করছেন তার সহপাঠী, চিকিৎসক সমাজসহ ভার্চুয়ালবাসীরা।

অ্যাপোলো হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল ডিপার্টমেন্টের রেজিস্ট্রার ডা. আসিফ সৈকত লেখেন, রাফা ! আল্লাহ তোমাকে জান্নাতবাসী করুন বোন। মৃত্যুর কাছে আমরা অসহায়, ভীষণ অসহায়।

ডা. নাসিমুন নাহার স্মৃতিচারণ করে লেখেন, আমার দিনের সুদীর্ঘ সামার ভ্যাকেশনে এবার আমার ঢাকা আসার অন্যতম কারণ ছিল রাফা। ওর সঙ্গে দেখা করা, কিছু সময় ওর সঙ্গে কাটানো, কিছু মানুষের ভালোবাসার বার্তা নিয়ে দেখা করতে গিয়েছিলাম রাফার সঙ্গে। একজন ক্যানসারের রোগী কতখানি মানসিক শক্তিতে বলীয়ান হতে পারে অল্প কিছু সময় রাফার সঙ্গে কাটিয়ে তা উপলব্ধি করছিলাম।

তিনি আরও লেখেন, আজ (শুক্রবার) সকালে এ খবরটা জানার পর থেকে ওর মুখটা চোখে ভাসছে-লিফট থেকে নেমে ওর বাসায় দরজার বেল বাজালে হাসিখুশি মুখের একটা মেয়ে দরজা খুলে দিল। প্রাণবন্ত উচ্ছল এই মেয়েটি ছিল আমাদের রাফা।

ভাসকুলার সার্জন ও মাইটিভির সিনিয়র নিউজ প্রেজেন্টার ডা. সাকলায়েন রাসেল লেখেন, নিজের জন্য প্রার্থনা করার সবটুকু সুযোগ চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে রাফা। অর্থ, ভালোবাসা, স্নেহ, প্রার্থনা..সব..সবই পেয়েছিল রাফা! পেল না শুধু বেঁচে থাকার আরেকটু সময়!

তিনি আরও বলেন, ‘হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। কত স্বপ্ন আর পরিকল্পনায় বিভোর ছিলাম আমরা, রাফা ফিরবে।এই সাহসী কন্যার মুখে শুনব বেঁচে থাকার গল্প। সব শূন্য হয়ে গেল আজ। বোনরে… ভালো থাকিস ওপারে।’

গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক ডা. নাজমুল হোসেন লেখেন, ‘জীবন কত সংক্ষিপ্ত! মৃত্যু কত সন্নিকটে! আল্লাহ জান্নাত নসিব করুন বোনকে।’

রাফার হাসিমাখা ছবি পোস্ট করে জনপ্রিয় লেখক ও অনলাইন এক্টিভিস্ট ডা. মুহিব্বুর রহমান রাফে লেখেন, ‘এ হাসিটা আর কোনোদিন আপনাকে আমাকে আকুতি নিয়ে ডাকবে না। শুধু একটু বাঁচতেই চেয়েছিল সে।

স্রষ্টার ইচ্ছা যখন মানুষের ক্ষুদ্র চেষ্টাকে ছাড়িয়ে যায়, তখন উপলদ্ধি হয়, ডাক্তাররা সত্যিই ক্ষমতাহীন, অসহায়। কারো চলে যাওয়া আটকাতে পারেন না। কাউকে বাঁচাতে পারেন না, এমনকি নিজেকেও না।’

তিনি আরও বলেন, যৎসামান্য হলেও সবাই মিলে তার পাশে দাঁড়াতে পেরে বিবেকের দায়মুক্ত হতে পেরেছি। যাওয়ার আগে রাফা প্রমাণ করে গেল; যত কঠিন হোক, চিকিৎসক কমিউনিটি যদি সত্যিই একসঙ্গে মিলে পজিটিভ কিছু করতে চায়, সেটা অবশ্যই সম্ভব। রাফা আমাদের সমাজে একটি ভালোবাসার নাম, ভালোবাসা ও ঐক্যের প্রতীক। জান্নাতের পাখি হয়ে ভালো থাকুক রাফা।

কুমিল্লার স্বাচিপ নেতা ডা. কামরুল হাসান লেখেন, হে মহান স্রষ্টা, রাফা বোনটিকে তুমি তোমার জান্নাতে একটু জায়গা করে দিও।

রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী উসামা বিন রাইয়্যান লেখেন, ‘আল্লাহ তুমি রাফা আপুকে ক্ষমা করে দিও। বোনকে জান্নাত দাও। সত্যিই আপুর এ খবর শুনে চোখের পানি আটকাতে পারিনি। কত উৎসাহ না দিতেন আমাকে। আল্লাহ তুমি আপুকে পরপারে ভালো রেখ।’

রাফার সহপাঠী সংগীতশিল্পী ও রেডিও জকি কনিকা বিশ্বাস কনা লেখেন, খুব বেশি কিছু বলার নেই আমার। তোর লাস্ট ফোন কলটা, লাস্ট কথাগুলো কানে বাজছে! একসঙ্গে নাচ আর ভ্যানিলা কেক আর হলো না, আর নাহ্…

রাফার শোকে কাতর তার বান্ধবী ডা. হুমায়রা কানিজ লেখেন, কথা দিয়েছিলে ফিরে আসবে তাহলে আমাদের ছেড়ে এত দূরে কীভাবে গেলে?

উল্লেখ্য, আদ দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন জেরিন তাসনিম রাফা। মরণঘাতী ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে বৃহস্পতিবার ভোররাত সাড়ে ৩টায় দিল্লির বি এল কাপুর সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

রাফার পারিবারিক সূত্র জানায়, ভারতে চিকিৎসাধীন রাফার অবস্থা গত সোমবার থেকে সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।

তার এলোজেনিক বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশনের জন্য দরকার ছিল ৮০ লাখ টাকা। এই প্রক্রিয়াটি দেশে সম্ভব না হওয়ায় চিকিৎসক সমাজ ও দেশবাসীর কাছে হাত বাড়ায় রাফার পরিবার। পরবর্তীতে এ টাকা জোগাড়ও হয়। কিন্তু বাঁচানো গেল না তাকে।

কনটেন্ট ক্রেডিট: মেডিভয়েস।