শনিবার, ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

তেলের দাম কমানো নিয়ে চিঠি চালাচালি

imagesঅনেক আলোচনা-সমালোচনার পর অবশেষে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে দফায় দফায় দাম কমতে থাকায় দেশের বাজারে কী পরিমাণ মূল্য কমানো যায়, সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ
মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জানতে চেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। শিগগিরই ওই চিঠির জবাব অর্থ মন্ত্রণালয়কে দেবে জ্বালানি বিভাগ। বাংলাদেশ পেট্রলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে এ খবর জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রতি ব্যারেলে এযাবৎকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এলেও দাম কমানোর কোনো উদ্যোগ ছিল না সরকারের। সুফলভোগী হতে বঞ্চিত ছিল সাধারণ জনগণ। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমায় ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে জ্বালানি তেলের দাম কমানো হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বেশ কয়েকবার জ্বালানি তেলের দাম কমানোর ইঙ্গিত দিলেও কার্যত দাম কমানোর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
বিপিসি সূত্র জানায়, দেশের বাজারে দাম কমানো হলেও তা আন্তর্জাতিক বাজার দরের সঙ্গে সমান্তরাল করা নাও হতে পারে। বিপিসির মুনাফা রেখে দাম নির্ধারিত হবে। তবে সেটা সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলাপ-আলোচনা করেই ঠিক করা হবে। খুব শিগগিরই এ ব্যাপারে সরকারি সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সূত্রেমতে, জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে দেয়া চিঠিতে জানতে চাওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমায় বিপিসির সর্বশেষ আর্থিক অবস্থা কী পরিমাণে দাঁড়িয়েছে ও বর্তমানে কত দামে বিপিসি তেল আমদানি করেছে।
এ সম্পর্কে বিপিসি চেয়ারম্যান এএম বদরুদ্দোজা জানান, তেলের দাম কমানোসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি এসেছে। ওই চিঠির জবাব খুব শিগগিরই দেয়া হবে। টেবিল ওয়ার্ক চলছে। তবে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় বা কমানোর বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বলে জানান তিনি। বিপিসির এক কর্মকর্তা বলেন, দেড় বছর ধরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় বিপিসি তার দীর্ঘদিনের লোকসান কমিয়ে নেয়ার সুযোগ পেয়েছে। গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বিপিসি ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। বিশ্ববাজারে দরপতন এ অবস্থায় থাকলে বিপিসি আগামী অর্থবছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করবে বলে তিনি জানান। আরেক কর্মকর্তা বলেন, বিপিসি যে মুনাফা করেছে, তা দিয়ে ইতিমধ্যে সব ঋণ পরিশোধ করার পরও প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা উদ্বৃত্ত আছে।
উল্লেখ্য, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বর্তমানে ১২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। দুই বছর আগে ব্যারেলপ্রতি দাম ছিল ১২২ ডলার (১ ব্যারেল=১৫৯ লিটার)। প্রায় দেড় বছর ধরে বিপিসি জ্বালানি তেল বিক্রি করে লাভ করে আসছে। দেশে সর্বশেষ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয় ২০১৩ সালের ৪ঠা জানুয়ারি। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ১২০ ডলার। আর বর্তমানে ২৯ ডলার। ১৩ সালের আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য নির্ধারণ করা হয়। দাম বাড়ার কারণে ২০১১-১৩ পর্যন্ত সময়ে ৫ দফায় বাড়ানো হয় তেলের দাম। সেই দামেই এখনও বিক্রি হচ্ছে। বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি লিটার অকটেনে লাভ হচ্ছে ৪০ টাকা। কেরোসিন, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলে লাভ হচ্ছে লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২৫ টাকা।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মার্চেন্ট ব্যাংক গোল্ডম্যান সাক্সের বিশ্লেষকরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি রাজনীতির কারণে ২০১৪ সালের জুন মাস থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করে। বর্তমানে তা ব্যারেলপ্রতি ২৮ ডলারের কাছাকাছি নেমে এসেছে। ইরানের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধ প্রত্যাহারের পর প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০ ডলার পর্যন্ত নেমে আসার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে বলে পূর্বাভাস দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। প্রতিষ্ঠানটি পূর্বাভাস দিচ্ছে, ২০২০ সালের আগে তেলের দাম আর ৫০ ডলারের ওপরে যাবে না।
এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ, সিপিডি, বিশ্বব্যাংক এবং গবেষকেরা জ্বালানি তেলের দাম কমালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনসহ বেশ কিছু সুফলের কথা একাধিকবার বলেছেন। এছাড়া সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী তেলে দাম কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। ওই সময় তিনি বলেছেন, এখন জ্বালানি খাতের সর্বশেষ বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার দেশে তেলের দাম যৌক্তিক করার উদ্যোগ নিয়েছে। এখন দাম কমানোর বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে এটা মন্ত্রিসভার সিদ্ধন্তের ওপর নির্ভর করছে। মন্ত্রিসভা যদি সম্মতি দেয় তাহলে হয়তো জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হবে।
অন্যদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় পূর্বাভাস দিয়েছে, জ্বালানি তেলের দাম কমলে প্রবৃদ্ধি বাড়বে। সংস্থাটি হিসাব দিয়ে বলেছে, জ্বালানি তেলের দাম গড়ে ১০ শতাংশ কমানো হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০.৩ শতাংশ বাড়বে। আর তৈরি পোশাকের রপ্তানি বাড়বে ০.৪ শতাংশ। ভোক্তা চাহিদা বাড়বে ০.৬ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতি কমবে ০.২ শতাংশ। এতে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে জনগণ, বিশেষত গ্রামের জনগোষ্ঠী।
জানা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানি খাতে মোট ৩৮ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছিল। দাম কমায় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা ১৭ থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এর আগে ২০১০-১১ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সরকার জ্বালানি তেলে ৩৩,৪৮০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। তবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে বিপিসি।