সোমবার, ১৫ই অক্টোবর, ২০১৮ ইং ৩০শে আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

সর্বরোগের চিকিৎসা দিচ্ছে ‘কাঁচি’ কবিরাজ!

ভালুকা প্রতিনিধি : কাঁচি কবিরাজের ঝাঁড় ফুক দেওয়া তেল ও পানিতেই সেরে যাবে যে কোন রোগ, পূরণ হবে মনোবাসনা, সমাধান মিলবে হাজার মুশকিলের। লোক মুখে এমন খবর পেয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন ছুটে আসছে মানসিক রোগী, প্রতিবন্ধী, বাত ব্যথা, সাপে কাটা, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাসহ হাজার-হাজার মানুষ। ঘটনাটি ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার মল্লিকবাড়ি ইউনিয়নের বর্তা গ্রামের রহিম মিয়ার ছেলে রাজমিস্ত্রী উজ্জল মিয়া ওরফে কাঁচি কবিরাজের বাড়িতে।

কাঁচি কবিরাজ একসাথে ৫০০ থেকে ১ হাজার নারী-পুরুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে তেল ও পানির বোতল আকাশের দিকে তাঁক করিয়ে রাখার নির্দেশ দিয়ে লোহার তৈরি কাঁচি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঝাঁড় ফুঁক দেন।

জানা যায়, প্রায় দুই মাস আগে উজ্জল মিয়ার মা হেনা আক্তারকে বাড়ির পাশে লাকড়ি কুঁড়াতে গেলে সাপে কাঁটে। পরে বাড়িতে এসে বললে সাপের বিষ অলৌকিক ক্ষমতার মাধ্যমে উজ্জল নাকি নিজের শরীরে নিয়ে নেয়। বিষয়টা জানাজানি হলে প্রথমে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসা দেওয়া শুরু করে উজ্জল। তারপর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কাঁচি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঝাঁড় ফুক দেওয়া তেল ও পানি পড়া নিতে শত শত উৎসুক মানুষের ঢল নামে। এ তেল ও পানি পড়ার বিনিময়ে কোন প্রকার টাকা বা উপহার নেন না বর্তমানে ‘কাঁচি কবিরাজ’ হিসেব পরিচিত উজ্জল। প্রতিদিন তেল ও পানিতে ঝাঁড় ফুঁক দিয়ে পড়ে নিতে বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার মানুষ আসে এখানে।

প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে ও কাঁচি কবিরাজের খাদেমদের কাছ থেকে চোখে পরার মত কোন রুগী সুস্থ হয়েছে বা কারও মনোবাসনা পূরণ হয়েছে এমন তথ্য মিলেনি। যারা কোন প্রকার উপকারিতা না পায় তাদেরকে বলা হয় একদিনে এটা হবে না নিয়ম করে অন্তত ৩ দিন আসতে হবে। প্রতিবেদক পরিচয় গোপন রেখে স্বপ্নে সাপে কেঁটেছে অভিনয় করে কবিরাজের চিকিৎসা নিতে যায়। পরে কবিরাজ কাঁচি দিয়ে প্রকৃত সাপে কাঁটা রুগীর মতই তুলা রাশি ব্যক্তির মাধ্যমে শরীর থেকে বিষ নামায়। প্রতিবেদককে বিষ মুক্ত করার পর বাড়িতে চলে যাওয়ার বলা হয়। পরে প্রতিবেদক স্বপ্নে সাপে কাঁটার বিষয়টি অভিনয় জানালে কবিরাজ ক্ষিপ্ত হয়ে বলে তর শরীরে অন্য বিষাক্ত বিষ ছিলো।

নেত্রকোনা থেকে আসা সুফিয়া বেগম (৭০) কোমরে বাত ব্যথার জন্য এখানে আসেন। এটা তার চিকিৎসার ২য় দিন। নিয়মমাফিক মোট ৩ দিন আসতে হবে এখানে। বৃদ্ধা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলেন, বাবারে যে নিয়ম দিছে কবিরাজ ওইডা আমি মাই না (মেনে) চলবার পারতামও না। আমার কম্মর (কোমর) বেদনাও (ব্যথা) বালা অইতো না।

কিশোরগঞ্জ থেকে প্রতিবন্ধী ছেলে রাছেল (১৫) নিয়ে আসা বাদল ফকির বলেন, আমার পাশের গ্রামের এক বোবা মেয়ে নাকি এখানে এসে ভালো হয়েছে তাই আমার ছেলেকে নিয়ে আসলাম দেখি আল্লাহ্ কি করে। ওই বিশ্বাস থেকেই এখানে আসা।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, উপজেলার বাসট্যান্ড থেকে ওই এলাকার অটো-রিক্সা চালকসহ স্থানীয় কয়েক জনের একটি চক্র আগত নারী-পুরুষদের আগ্রহের সাথে জানাচ্ছেন রোগ মুক্তি ও মুশকিল আসানের গল্প। দাবি করছেন নিজের চোখে দেখারও।

আসাদ নামের এক যুবক বলেন, তার পরিচিত বেশ কয়েকজন বাত-ব্যথা, অন্ধ, বোবা, শ্বাসকষ্টের রোগীরা এখানে এসে সুস্থ হয়েছে।

এ ব্যাপারে স্থানীয় চেয়ারম্যান আলহাজ্ব এস এম আকরাম হোসেন জানান, আমি বিষয়টি খোঁজ নিতে সশরীরে দেখতে গিয়েছি। কেউ কেউ বিভিন্ন রোগ-বালাই থেকে ভালো হচ্ছে বলে দাবি করছে স্থানীয়রা। তাছাড়া ওই কবিরাজ তেল ও পানি পড়ার বিনিময়ে কোন টাকা বা উপহার নিচ্ছে না।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাসুদ কামাল জানান, বিষয়টি আমি শুনেছি, এ বিষয়টা খতিয়ে দেখার দরকার আছে। আমরা অনুসন্ধান করছি। অতি শীঘ্রই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।