শনিবার, ২৩শে ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং ৯ই পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

হজের তাৎপর্য ও শিক্ষা

AmaderBrahmanbaria.COM
আগস্ট ২৫, ২০১৫
news-image

---

মাওলানা এসএম আনওয়ারুল করীম : হজ বিশ্ব মুসলিমের এক ঐতিহ্যবাহী সম্মিলন। মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক হজ। ভ্রাতৃত্বের এক মহাসম্মেলন ঘটে এই হজে। তবে হজ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলেও যে অর্থে এ পর্ব পালন করা আবশ্যকীয় ছিলো, অধিকাংশ মানুষই সেই শিক্ষা গ্রহণ করেন না। আলেমগণ হজের সফরকে পরকালের সফরের সাথে তুলনা করেছেন। হজযাত্রীকে আত্মীয়-স্বজন, ঘর-বাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, বন্ধু-বান্ধব, স্ত্রী-সন্তান সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে হয়। হজ পালনকারী পরকালের যাত্রীর ন্যায় সব কিছু ত্যাগ করে হজের সংকল্প করে বের হয়। পরকালের যাত্রীকে যেমন সাদা কাফন কাপড় পরিয়ে খাটিয়ায় সাওয়ার করানো হয়, তেমনি হজযাত্রী মৃত ব্যক্তির কাফনের ন্যায় ইহ্রামের দু’ টুকরো শ্বেত-শুভ্র সেলাইবিহীন কাপড় পরিধান করে যানবাহনে আরোহণ করে। কিয়ামত দিবসে আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেয়ার মত হজ পালনকারীর কণ্ঠে উচ্চারিত হতে থাকেÑ “লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক; ইন্নাল হামদা ওয়ান্নি’মাতা লাকা ওয়াল মূল্ক- লা শারীকা লাক্।” মৃত্যুর পর যেমন সাওয়াল-জওয়াবের সম্মুখীন হতে হবে, তেমনি হজের সফরে হাজীদেরকে বিমান বন্দরসহ সংশ্লিষ্ট স্থানে সরকারি-বেসরকারি লোকদের নিকট বিভিন্ন প্রশ্নের অবতারণাসহ পরীক্ষা-নিরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। মক্কা শরীফে প্রবেশ করা যেন ঐ জাহানে প্রবেশ করাÑ যেখানে শুধুই আল্লাহর রহমত। বায়তুল্লাহ শরীফের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করা আরশে আজিমের চতুর্দিক প্রদক্ষিণ করার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সাফা ও মারওয়া সায়ী করা হাশরের ময়দানে দিশেহারা হয়ে এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করার ন্যায়। সূর্যের প্রচ- খরতাপে আরাফার ময়দানে লাখ লাখ মানুষের অবস্থান যেন হাশরের মাঠের সাদৃশ্য। হজের প্রতিটি আমলেই হাজীগণের সামনে কিয়ামতের চিত্র ভেসে উঠে। আল্লাহর ইশ্ক ও মহব্বত প্রকাশ করা এবং রুহকে প্রকৃত প্রেম ও ভালোবাসায় রঞ্জিত করার এক অপূর্ব দৃশ্য হজ। প্রেম আকর্ষণে মাতোয়ারা প্রেমিকের ন্যায় হাজীর অন্তরাত্মায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইশ্কের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে। দারুণ আগ্রহ-উদ্দীপনায় হাজী সাহেবগণ তাঁর মহান দরবারে ভিড় জমায়। আল্লাহ্ পাকও চান তাঁর ইশ্কে প্রেমিকগণ পাগল বেশে এভাবে তাঁর নিকট ছুটে আসুক। হাজীগণ আল্লাহর সান্নিধ্য পেতে তাঁর ইশ্কে মাতোয়ারা হয়ে সেলাইবিহীন সাদা কাপড় পরিধান করে পাগল ও ফকিরের বেশে এলোমেলো চুল-দাড়ি নিয়ে মাঠ-ঘাট, পাহাড়-পর্বত, নদী, সাগর-মহাসাগর, বন-জঙ্গল, মরু প্রান্তর অতিক্রম করে চিৎকার দিয়ে “লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক …… উচ্চারণ করে ছুটে চলে বায়তুল্লাহর উদ্দেশ্যে। পবিত্র মক্কা এবং মদিনায় পৌঁছে একজন হাজী মনে করে জান্নাতে পৌঁছে গেছি। আর আবেগ সমুদ্র এতটাই তরঙ্গায়িত হয়, যা’ বর্ণনা করা এবং অনুধাবন করা কঠিন। ইহ্রাম বাঁধা আল্লাহর প্রকৃত প্রেমিক হওয়ার এক জ্বলন্ত নিদর্শন। হাজরে আসওয়াদে চুমু খাওয়া, মুল্তাজামে জড়িয়ে ধরা, কা’বার চৌকাঠে মাথা ঠুকে কান্নাকাটি করা, বায়তুল্লাহর চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করা ইশ্কে ইলাহীর অনুপম দুশ্য। তারপর সাফা-মারওয়া দৌড়াদৌড়ি, মিনায় গমন, আরাফায় অবস্থান, খোলা আকাশের নিচে ধূলি-ধূসরিত কঙ্করময় মুযদালিফায় রাত্রি যাপনÑ প্রতিটি আমলেই আল্লাহর প্রেমের প্রতিফলন। জামরাতে শয়তানকে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপ, পশু কোরবানি ও মাথা মু-ানোর মাধ্যমে অনুরাগের শেষ মঞ্জিল অতিক্রম করে নিষ্পাপ শিশুর মত হাজী সাহেবগণ নিজ মোকামে ফিরে আসলেও তাদের অন্তরে জ্বলতে থাকে পুনঃমিলনের অনির্বাণ শিখা। রাজনৈতিক, আন্তর্জাতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটেও হজের গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমান সমস্যাসঙ্কুল বিশ্বে ইসলামের উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইসলামী চিন্তাবিদগণ হজ মৌসুমে সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। হজ মুসলিম উম্মাহর ধর্মীয় চেতনায় উদীপ্ত হওয়ার এবং আপোষ, একতা ও সম্পর্ক স্থাপনের সিঁড়ি। হজের সমাবেশে ইসলামী জনতা, দেশ, জাতি, ভাষা, বর্ণ, গোত্র ইত্যাদি বৈষম্য অবসান ঘটিয়ে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব স্থাপনের মহান সুযোগ পায়। হজের বিশ্ব মুসলিম সম্মেলন “মুুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই”-এর বাস্তব দৃশ্য। হজের পোশাক চাল-চলন সুশৃঙ্খল জীবনব্যবস্থার নিদর্শন। বিশ্ব রাজনীতিতে মানবগোষ্ঠীর মধ্যে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে হজ একটি সার্থক এবং সফল আমল। এখানে ধনী-গরীব, বাদশা-ফকির, সাদা-কালো, ভিন্ন শারীরিক কাঠামো, ভিন্ন ভাষার মানব জাতির একই বেশ ভূষা, একই আমল এবং একই স্থানে একত্রে জীবন-যাপন। সারা বিশ্বের মানুষের সামাজিক জীবন ব্যবস্থার খোঁজ-খবর নেয়ার, বিভিন্ন দেশের আলেম, জ্ঞানী-গুণীদের সান্নিধ্য পাওয়ার বিশেষ সুযোগ এনে দেয় হজ। ইসলামের পবিত্র স্থান মক্কা মদিনায় ঐতিহাসিক বহু ইসলামিক নিদর্শন দর্শনসহ রসূল পাক (সা.), তাঁর আওলাদ ও তাঁর সাহাবা কেরামদের (রা.) স্মৃতিসমূহ স্ব-চক্ষে দর্শনের অপূর্ব ব্যবস্থা হজ। বিশ্ব মানবতার ঐক্য-সংহতি-চেতনা জাগ্রতসহ পরকালের মুক্তির মহান ব্যবস্থা হজ। আমিত্ব ও স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে হজের সময় প্রাচ্য-প্রতীচ্যের অগণন বনি আদম মক্কায় সমবেত হন। যাদের অন্তরের কামনা এক, পরনের কাপড় এক, মুখে উচ্চারিত ধ্বনি এক লাব্বাইক! আলাহুমা লাইব্বাইক! হজ ধর্মীয় কর্তব্য ও আল্লাহর নির্দেশ পালন। ‘মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই ঘরের হজ করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য।’ (সূরা আল ইমরান ৯৭)। হজে সবার একমাত্র উদ্দেশ্য আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং পাপমুক্ত হয়ে সুস্থ জিন্দেগি যাপন। তাই আকার, আকৃতি, প্রকৃতি, পেশা, বর্ণ, ভাষায় পার্থক্য সত্ত্বেও সব প্রেমিক হাজীদের মধ্যে অভিন্ন চেতনা লক্ষণীয়। কারো মধ্যেই নেই হিংসা-বিদ্বেষ, আভিজাত্যের অহঙ্কার। কোনো আরবের ওপর অনারবের, অনারবের ওপর আরবের, সাদার ওপর কালোর বা কালোর ওপর সাদার নেই শ্রেষ্ঠত্ব। আরাফাত, মুজদালিফা, মিনায় যথাসময়ে ও শান্তিপূর্ণভাবে কর্ম সম্পাদনেও রয়েছে এ মহৎ চেতনার প্রশিক্ষণ। আধুনিক বিশ্বে অশান্তির মূল কারণ নৈতিক চরিত্রের অধঃপতন। খোদাভীতির হজ মানুষের নৈতিক চরিত্র উন্নত করে এবং মনকে করে আকাশের মতো বড়। তবে এর জন্য প্রয়োজন নিয়তের পরিশুদ্ধতা, অন্তরাত্মার পবিত্রতা এবং হালাল টাকায় হজের কার্য সম্পাদন করা। তবেই আল্লাহর প্রেমিক হাজীরা হজের কোরবানির মাধ্যমে মনের পশুপ্রবৃত্তি ও কুপ্রবৃত্তিকে কোরবানি করে হতে পারবে সোনার মানুষ। তখনই তারা আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধরবে, পরপর বিচ্ছিন্ন না হয়ে একে অন্যের কল্যাণে উজ্জীবিত হবে। ইব্রাহিমি আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে এবং মুহাম্মদি প্রেমের বাণী নিয়ে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম হবে সমগ্র বিশ্বে। কিন্তু মক্কা-মদিনার প্রেমের জ্যোতির্ময় চাদর অঙ্গে জড়িয়েও যাদের মনের ইবলিসি ভাব দূর হয় না তারা বড়ই হতভাগা! তাদের হজ বিলাস ভ্রমণ বা নেহায়েতই মহাসমেলনে অংশগ্রহণ ছাড়া আর কিছু নয়। আল্লাহর গায়েবি ডাকে সাড়া দিয়ে আল্লাহর কাছে নিজেকে সোপর্দ করতে ব্যর্থ হয় তারা। হজ মূলত হাজীদের পারস্পরিক সম্প্রীতি ও নৈতিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেয়। আল্লাহর রাস্তায় মানুষের জান, মাল উৎসর্গ করতে উদ্বুদ্ধ করে। হাজীদের পাপমুক্ত করে। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে হজের উদ্দেশ্যে এ ঘরে আগমন করে কোনো নির্লজ্জ কথা না বলে এবং ফাসেকি না করে সে নবজাতক শিশুর মতো নিপাপ হয়ে গৃহে প্রত্যাবর্তন করে।’ (বুখারি, মুসলিম)। এমন হাজিদের পর্শে অন্যেরা আলোকিত হয়, উন্নত চরিত্রের অধিকারী হয়। মানুষ বুঝতে শিখে ইসলাম ধর্ম কোনো বিভেদ সৃষ্টিকারী নয় বরং যাবতীয় মতানৈক্য নিরসনকারী ও শান্তির ধর্ম। বিজ্ঞানের যুগে যুদ্ধ, সংঘাত, অশান্তি ও অনাচার মোকাবেলায় পৃথিবীবাসীর জন্য হজের তাকওয়ার শিক্ষা, সৌভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব, শৃঙ্খলা, ঐক্য ও সংহতির শিক্ষা অপরিহার্য। হজ আজকের অবহেলিত ও নিপীড়িত মুসলিম বিশ্বের জন্য আলোর মিছিল, প্রেমের অভ্যুত্থান। লেখক: ভাষ্যকার, বাংলাদেশ বেতার সাবেক কলেজ শিক্ষক