বৃহস্পতিবার, ২২শে জুন, ২০১৭ ইং ৮ই আষাঢ়, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

ট্রানজিটে লাভের ষোল আনাই ভারতের, বাংলাদেশের পুরোটাই ক্ষতি

AmaderBrahmanbaria.COM
সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৬

---

৪ দেশীয় সড়ক যোগাযোগে ভারতের ৩টি শহরে সীমাবদ্ধ বাংলাদেশের যানবাহন চলাচল : ভারত বাংলাদেশের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তসহ দুই সমুদ্রবন্দরও ব্যবহার করবে
মাসুল ছাড়াই ‘বিশেষ ট্রানজিট’ সুবিধা নিচ্ছে ভারত। এ সুবিধার মাধ্যমে বাংলাদেশের সিলেট ও মৌলভীবাজার সীমান্তের স্থলপথ ব্যবহার করে আসাম থেকে ত্রিপুরায় তেল পরিবহন করেছে দেশটি। অন্যদিকে, বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল (বিবিআইএন) সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে ভারত পুরো প্রস্তুতি নিলেও শুল্ক নির্ধারণে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, চার দেশীয় এই সড়ক যোগাযোগে বাংলাদেশের লাভের খাতা শূন্যই থাকবে। ষোল আনাই ভোগ করবে ভারত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক আনু মুহাম্মদ বলেন, ট্রানজিটের সুবিধা বাংলাদেশ নয়, ভারতের জন্য। কারণ কলকাতা থেকে আগারতলা যেতে দীর্ঘপথ ব্যবহার করতে হতো। আগারতলা যেতে শিলিগুঁড়ি, আসাম, মেঘালয়, করিমগঞ্জ হয়ে পাড়ি দিতে হতো ১ হাজার ৫৬০ কিলোমিটার পথ। এ জন্য সময় লাগত ৮ দিন বা ১৯২ ঘণ্টা। ট্রানজিট ব্যবহারে কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা পথে যেতে সেই দূরত্ব এক হাজার কিলোমিটার কমে হয়েছে ৫৫৯ কিলোমিটার। তাই এই সুযোগ বাংলাদেশের কোনো কাজে আগেও লাগেনি, সামনেও লাগবে বলে মনে হয় না। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের সড়কপথ ব্যবহার করে ভারতের এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে জ্বালানি পরিবহনের জন্য গত ১৮ আগস্ট ঢাকায় বাংলাদেশের সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সঙ্গে ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটেডের (আইওসিএল) মধ্যে এক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত (এমওইউ) হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের সড়কপথ ব্যবহার করতে ভারতকে এ বিশেষ ট্রানজিটের অনুমোদন দেয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী ভারতের জ্বালানি তেলবাহী ট্রাক-লরি উত্তর আসামের বঙ্গাইগাঁও ও মেঘালয় থেকে সিলেটের তামাবিল সীমান্তের ডাউকি পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার চাতলাপুর চেকপোস্ট দিয়ে ত্রিপুরায় যাবে। জানা গেছে, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত বাংলাদেশের সিলেট ও মৌলভীবাজার সীমান্ত ব্যবহার করে আসাম থেকে ত্রিপুরায় ১০টি ট্রেইলার ট্রাক প্রবেশ করেছে। রাজস্ব বোর্ডের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও চুক্তি বিভাগের দ্বিতীয় সচিব মো. জিয়াউর রহমান খান স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে ‘বিশেষ ট্রানজিট’ সুবিধা দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে বলা হয়, ভারতের আসাম-ত্রিপুরার কয়েক সপ্তাহের বর্ষণ এবং পাহাড়ধসের কারণে আসাম থেকে ত্রিপুরাগামী সড়কপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে দুই রাজ্যের মধ্যে যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া ত্রিপুরা রাজ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ জন্য বাংলাদেশের আংশিক সড়কপথ ব্যবহার করে ত্রিপুরায় জ্বালানি তেল ও এলপিজি পরিবহনের জন্য ভারত বাংলাদেশের সহযোগিতা চায়। ভারতের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ৭ সেপ্টেম্বর অর্থমন্ত্রী বিশেষ অনুমোদন দিয়ে রাজস্ব বোর্ডের কাছে কিছু সিদ্ধান্ত পাঠান। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ত্রিপুরায় ভারতের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি পরিবহনের জন্য ভারতকে বিশেষ ট্রানজিট সুবিধা প্রদান করা হবে। একই সঙ্গে কাস্টমস আইন-১৯৬৯ অনুযায়ী ট্রানজিট পণ্য পরিবহনের ওপর কস্ট সার্ভিসের আদায়যোগ্য ফিগুলো এবং ট্রানজিট পণ্য পরিবহনকারী যানবাহনের ওপর প্রযোজ্য শুল্ককর মওকুফ করা হবে। এ ছাড়া ট্রানজিট পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে গ্যারান্টি দাখিলের শর্ত হতে অব্যাহতি দেয়া হবে ভারতকে। সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার যেসব শুল্ক স্টেশন চেকপোস্ট দিয়ে ট্রানজিট পণ্য পরিবাহিত হবে সেসব স্টেশনে ট্রানজিট সংক্রান্ত বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক (ফটোকপি) রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভারতকে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নকরণ করতে নির্দেশ এবং বাংলাদেশে থেকে ট্রানজিট পণ্যের পরিবহনের ক্ষেত্রে কাস্টমস নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের পদক্ষেপের কথাও জানানো হয়। বাংলাদেশের এই অনুমোদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৭ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫০টি ট্রেইলার ট্রাক (১২ দশমিক ১৫ টন ওজনের) এবং ৩০টি এলপিজিবাহী ট্রাকসহ (৭ টন ওজনের) মোট আনুমানিক ১৬০টি ট্রাক বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করবে। এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে সিলেট সীমান্তে অবস্থিত মৌলভীবাজার জেলার প্রায় ১৪০ কিলোমিটার সড়কপথ। এ পথ অতিক্রম করে মৌলভীবাজার জেলার চাতলাপুর-কৈলাশ্বর সীমান্ত চেকপোস্ট দিয়ে ত্রিপুরা প্রবেশ করবে। ত্রিপুরার জ্বালানি তেল খালাসের পর খালি ট্রাকগুলো আবার একই পথে ফিরে যাবে। এসব যানবাহন সিল্ড অবস্থায় বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে আসা-যাওয়া করবে। লাভের ষোল আনাই ভারতের এদিকে, একাধিকবার শুল্ক নির্ধারণে ট্রানজিট বিষয়ক কোর কমিটি, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রণালয় ও ট্রানজিট ফি নির্ধারণ-সংক্রান্ত যৌথ কারিগরি কমিটি (জেটিসি) আলোচনা করলেও শুল্ক নিধারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি কবে চূড়ান্ত করা হবে তা এখনো অনিশ্চিত। সূত্র জানায়, প্রথমে ট্রানজিট বিষয়ক কোর কমিটি সড়ক পথে বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রতিটন পণ্য পরিবহনের জন্য কিলোমিটার প্রতি ৪ টাকা ২৫ পয়সা চার্জ আদায়ের প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু কোর কমিটির প্রস্তাব উপেক্ষা করে তা ১ টাকা ২ পয়সা নির্ধারণ অর্থাৎ প্রস্তাবিত শুল্কের ৭৬ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। তবে মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে আপত্তি তুলে পুনরায় প্রস্তাব দিতে বলেছে ট্রানজিট ফি নির্ধারণ-সংক্রান্ত যৌথ কারিগরি কমিটি (জেটিসি)। বিষয়টি কবে চূড়ান্ত করা হবে তা এখনো নিশ্চিত নয়। সূত্র জানায়, চারদেশীয় সড়ক যোগাযোগের মোড়কে ভারতীয় যান চলাচল নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে ব্যয় করতে হবে ৪০ হাজার কোটি থেকে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। নামে ‘চারদেশীয় কানেকটিভিটি’ বা বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ইন্ডিয়া ও নেপাল) বলা হলেও থিম্পুতে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ভারতের মাত্র তিনটি শহরেই সীমাবদ্ধ থাকছে বাংলাদেশের যানবাহন চলাচল। অপরদিকে, ভারত বাংলাদেশের ভূখ-ের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত ব্যবহার করতে পারবে। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের দুই সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছে ভারত। জানা গেছে, বর্তমানে ধার্যকৃত প্রতিটনে ট্রানজিট ফি (শুল্ক) ৫৮০ টাকা, যা কমিয়ে ১৩০ টাকা করার প্রস্তাব করেছে ভারত। এনবিআরের পক্ষ থেকে প্রতিটন পণ্যের জন্য ট্রানজিট ফি ৫৮০ টাকা (৭ ডলার) নির্ধারণের বিষয়ে বলা হয়, প্রক্রিয়াকরণ বাবদ খরচ ১০, ট্রানশিপমেন্ট বাবদ ২০, স্ক্যানিং ব্যয় ৩০০, মার্চেন্ট ওভারটাইম ৪০, নিরাপত্তা ১০০, পণ্য এসকর্ট ফি ৫০, অটোমেশন ফি ১০ এবং অন্যান্য ফি ধরা হয় ৫০ টাকা। ভারত অবশ্য এই ফি বেশি উল্লেখ করে তা কমিয়ে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নীতিমালা অনুসরণের পরামর্শ দেয়। এই নীতিমালা অনুসরণ করা হলে প্রতিটন পণ্যের ক্ষেত্রে ট্রানজিট ফি ২ থেকে ৩ ডলারের বেশি হবে না। চার দেশীয় এই সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে শত কোটি ডলারের প্রকল্প অনুমোদন করেছে ভারত। এ প্রকল্পের আওতায় চার দেশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে ৫৫৮ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ ও উন্নয়ন করবে দেশটি। উপ-আঞ্চলিক বাণিজ্য ৬০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে ভারত এ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটি ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক বিভাগ অনুমোদন করেছে। এতে ৫০ শতাংশ অর্থায়ন করবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। প্রকল্পের আওতায় ভারতের অংশে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ ও মনিপুর। আগামী দুই বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
উৎসঃ ইনকিলাব

এ জাতীয় আরও খবর