বৃহস্পতিবার, ২৫শে মে, ২০১৭ ইং ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে ক্ষমাপ্রার্থী অর্থমন্ত্রী

AmaderBrahmanbaria.COM
সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৫

---

দেশের শিক্ষাঙ্গনে বিক্ষোভ-আন্দোলনের আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে অবশেষে ক্ষমা চাইলেন ৮৩ বছর বয়সী অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সেই সঙ্গে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফির ওপর ভ্যাট আরোপ এবং নতুন বেতন স্কেলে শিক্ষকদের মর্যাদার ব্যাখ্যাও দিলেন তিনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষকদের নিয়ে নিজের বক্তব্যের সমালোচনার শুরুতেই ব্যাখ্যা দিয়ে ক্ষমা চাওয়ার পথ এড়াতে পারতেন অর্থমন্ত্রী। সিলেকশন গ্রেড উঠে যাওয়ার পরও শিক্ষকরা যে আগের মতোই সচিবদের গ্রেডে ৭৮ হাজার টাকা বেতন পাবেন, এই তথ্যটা গত সোমবার মন্ত্রিসভায় বেতন কাঠামো পাসের পরপরই জানালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষ থেকে রাস্তায় নামতে হতো না। একই অবস্থা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফির ওপর আরোপিত ভ্যাটের ক্ষেত্রেও। জুন মাসে বাজেট ঘোষণার পর থেকেই শিক্ষার্থীরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে; কিন্তু অর্থমন্ত্রী কিংবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা যখন রাস্তা অবরোধ করে পুরো ঢাকা অচল করল তখন তড়িঘড়ি করে ব্যাখ্যা দিল এনবিআর, জরুরি সংবাদ সম্মেলন করলেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু ততক্ষণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কলেজ পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থা অচল হলে গেল, শিক্ষক আর শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুম থেকে রাস্তায় নামতে হলো।campus

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের এমন অনেক বেফাঁস বক্তব্য কিংবা যথাসময়ে কোনো সিদ্ধান্তের যোগ্য ব্যাখ্যা না দেওয়ায় সরকারকে প্রায়ই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। বেতন কাঠামোতে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল থাকবে কি না, তা নিয়ে নানা সময় নানা রকম কথা বলেছেন তিনি। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যখন জ্বালানি তেলের দাম না কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া আছে তখনই অর্থমন্ত্রী জানালেন, ২৩ সেপ্টেম্বরের আগেই তেলের দাম কমানো হবে। এর আগে হলমার্কসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংকের একটি শাখা থেকেই সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা লুটপাট করার পর তিনি বলেছিলেন, চার হাজার কোটি টাকা কোনো টাকাই না। তাঁর এসব বক্তব্যের প্রকাশ্যে কড়া সমালোচনা এসেছে দলের অন্য মন্ত্রী-এমপিদের মুখ থেকেই।

দুটি ভিন্ন বিষয় নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মাঠে নামার অনেক পরে গতকাল বৃহস্পতিবার দুটি বিষয়ের ব্যাখ্যা এলো অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও এনবিআরের কাছ থেকে। অর্থমন্ত্রী জানালেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভ্যাট দেবে, শিক্ষার্থীরা নয়। পরে এনবিআর থেকে এক বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে একই কথা জানানো হলো। অথচ ৪ জুন বাজেট ঘোষণার পর থেকে শিক্ষার্থীরা এ নিয়ে আন্দোলন করে আসছিল। পাবলিক ইউনিভার্সিটির শিক্ষকদের 'জ্ঞানের অভাব' সম্পর্কিত মন্তব্যের ব্যাখ্যাও অনেক পরে দিলেন অর্থমন্ত্রী। গত মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রীর ওই মন্তব্যের পর বুধবার তাঁকে বক্তব্য প্রত্যাহার করে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন। একই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি অর্থমন্ত্রীকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের আহ্বান জানায়। আলটিমেটামের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই গতকাল অর্থমন্ত্রী বললেন, সঠিক বাংলা মনে করতে না পারায় তিনি 'জ্ঞানের অভাব' শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছিলেন।

চলতি অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ১০ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করার পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ক্যাম্পাস-সংলগ্ন রাস্তায় ব্যানার বা প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছে। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে বলেছে, শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, তাই এ খাতে ভ্যাট বসানো অযৌক্তিক। শেষ পর্যন্ত কিছুটা কমিয়ে চূড়ান্ত বাজেটে রেখে দেওয়া সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে এসেছিল। কিন্তু তাদের যে ভ্যাট দিতে হবে না এ ব্যাখ্যা দেয়নি কেউ।

গত বুধবার তাদের আন্দোলন ক্যাম্পাসের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজপথে নামে। গতকাল দিনের প্রথমভাগে তারা অবরোধ করে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক। দুপুরে এনবিআর ব্যাখ্যায় বলেছে, এ ভ্যাট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। টিউশন ফির মধ্যে ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত থাকায় শিক্ষার্থীদের আলাদা ভ্যাট দিতে হবে না। সিলেটে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রীও একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, এ জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বাড়তি অর্থ আদায় করা উচিত হবে না।

তবে অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা, এনবিআরের ব্যাখ্যা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণার পরও শিক্ষার্থীরা আশ্বস্ত হতে পারছে না। যেখান থেকে এ দফায় আন্দোলনের উৎপত্তি, সেই ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ গতকাল বিকেলেই জানিয়েছে, তারা বাড়তি কোনো টাকা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেবে না। তার পরও সন্ধ্যা পর্যন্ত অবরোধ তুলে নেয়নি শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের সংগঠক এক ছাত্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পৃথিবীর কোনো দেশেই শিক্ষার ওপর ভ্যাট নেই। এই ভ্যাট পুরোপুরি তুলে নিতে হবে। তিনি বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফির বিষয়ে সরকারের একটা নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত। এটি হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের মনমতো টিউশন ফি আদায় করতে পারবে না।

অর্থমন্ত্রী ও এনবিআরের ব্যাখ্যার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেরাই ভ্যাট পরিশোধ করবে বলে ঘোষণা দিচ্ছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একজন প্রতিনিধি বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আর ভ্যাট নেবে না। শিক্ষার্থীদের অবরোধ প্রত্যাহারের অনুরোধও করেন তিনি। নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করে দুঃখ প্রকাশ করলেন অর্থমন্ত্রী : বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্পর্কে নিজের করা বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে সে বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গতকাল বিকেলে সিলেটে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানিয়ে বলেন, তিনি আশা করেন, তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে যে ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে এখানেই তার সমাপ্তি ঘটবে।

সিলেট সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেন, "আমি বলতে চেয়েছিলাম শিক্ষকরা যথাযথভাবে বিষয়টি অবহিত না হয়েই (আনইনফরমড) আন্দোলন করছেন। কিন্তু বলার সময় ইংরেজি 'আনইনফরমড' শব্দের সঠিক বাংলা মনে করতে না পারায় 'জ্ঞানের অভাবে' শব্দটি উচ্চারণ করেছি। অবশ্যই এটি অবমাননাকর। 'অনবহিতি' এবং 'জ্ঞানের অভাব' শব্দের অর্থ এক নয়।" তবে মন্ত্রী এও বলেন, 'আমি বিস্মিত যে তাঁরা সরকারি সিদ্ধান্ত জানার আগেই আন্দোলনে নেমে যান।'

অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অবনমন এবং স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলন সম্পর্কে গত মঙ্গলবার গণমাধ্যমে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, 'দেশের সবচেয়ে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী জ্ঞানের অভাবে আন্দোলন করছে। এই কর্মবিরতির কোনো জাস্টিফিকেশন নেই। তারা জানেই না পে স্কেলে তাদের জন্য কী আছে, কী নেই।' বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ইচ্ছামতো পদোন্নতি দেওয়া হয় মন্তব্য করে তিনি সেটাকে 'করাপট প্র্যাকটিস' বলে আখ্যায়িত করেন। অর্থমন্ত্রীর এ মন্তব্যের পর গত বুধবার সারা দেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা কর্মবিরতিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন এক বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানায়।

সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেন, 'আমাদের শিক্ষা জগতে বেশ ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে আমারই একটি বক্তব্য নিয়ে। আমার মনে হয় এই বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।' তিনি বলেন, 'সাংবাদিকরা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন কমিশনবিরোধী আন্দোলন সম্বন্ধে আমার মন্তব্য জানতে চাইলে আমি বলি যে তাঁদের এই আন্দোলনটি অকারণেই শুরু হয়েছে এবং এটা আমাকে গভীর পীড়া দেয় এ জন্য যে দেশের সবচেয়ে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী একটি আন্দোলন করছেন। আমার বলার কথা ছিল যে তাঁরা আন্দোলনে চলে গেলেন যখন তাঁরা পুরো বিষয়টি সম্বন্ধে অবগত ছিলেন না। তাঁরা জানতেন না যে সিদ্ধান্ত কী হয়েছে এবং সেই অবস্থায়ই আন্দোলনে চলে গেলেন।'

অর্থমন্ত্রী বলেন, "আমার বলা উচিত ছিল যে তাঁদের আন্দোলনটি তাঁদের অনবহিতির জন্য, তাঁরা সঠিক তথ্য জানতেন না বলে তাঁরা 'আনইনফর্মড' ছিলেন। তাঁদের আন্দোলন কিন্তু মন্ত্রিসভার বৈঠকের আগে থেকেই শুরু হয়। আমি বক্তব্য দেওয়ার সময় 'আনইনফর্মড' শব্দের যথাযথ বাংলা শব্দ খুঁজে না পাওয়ায় একটা অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করি। আমি যেভাবে বক্তব্যটি দিই তাতে অবশ্যই তাঁদের মানহানি হয়েছে। কারণ 'জ্ঞানের অভাবে' বলা আর 'যথাযথ তথ্য সম্বন্ধে অনবহিত' বলার মধ্যে অনেক তফাত রয়েছে। আমি আমার বক্তব্য সম্বন্ধে খুবই দুঃখিত, তবে বিস্মিত যে তাঁরা সরকারি সিদ্ধান্ত জানার আগেই আন্দোলনে নেমে যান।"

অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, 'আমার এই বক্তব্য যেভাবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তা অনভিপ্রেত ছিল এবং তা আমি প্রত্যাহার করছি। এ জন্য যাঁরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন বা দুঃখ পেয়েছেন তাঁদের কাছে বিনীত অনুরোধ যে ভুল বোঝাবুঝি এখানেই সমাপ্তি হোক।'

অর্থমন্ত্রী বলেন, 'ঘোষিত বেতন-ভাতার স্কেল হলো ২০টি এবং অধ্যাপকরা আগের মতোই সচিবদের সঙ্গে অবস্থান করছেন। সেই গ্রেডেই বেতন মাসিক ৭৮ হাজার টাকা পাবেন। তবে অধ্যাপকদের এই গ্রেডে যেভাবে পদোন্নতি হয় সেটা বেশ অস্বচ্ছ।' দেশের ৩৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জনবলের বিবরণ তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, 'অধ্যাপক রয়েছেন দুই হাজার ৯৫২ জন, সহযোগী অধ্যাপক এক হাজার ৯৯৪ জন, সহকারী অধ্যাপক তিন হাজার ৩৯১ জন এবং প্রভাষক দুই হাজার ৮৬৫ জন। এ থেকে দেখা যায় যে সচরাচর যে পিরামিড জীবনবেগী চাকরির (ঈধৎববৎ ঝবৎারপব) ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে তেমন নয়। এখানে নিম্ন শ্রেণির তুলনায় উচ্চ শ্রেণির পদ বেশি।'

অর্থমন্ত্রী বলেন, 'তাঁদের আন্দোলনের আর একটি বিষয় হচ্ছে স্বতন্ত্র বেতন স্কেল। সেই ইতিহাসে যাওয়া ঠিক হবে না। তবে জেনে রাখা ভালো, তাঁদের বেতন স্কেল আগে আলাদাই ছিল। তাঁদের দাবির মুখেই সেটি বাদ দিয়ে ১৯৭৩ সালে একক সর্বজনীন বেতন স্কেল করা হয়।' অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, তাঁর এই বক্তব্যের পর শিক্ষকরা তাঁদের সব কর্মসূচি প্রত্যাহার করবেন এবং দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসবেন।

ভ্যাট থাকবে, দেবে বিশ্ববিদ্যালয় : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহার হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেছেন, ভ্যাট প্রত্যাহারের কোনো কারণ দেখি না। তিনি বলেন, ভ্যাট প্রদান করবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কোনো শিক্ষার্থীকে ভ্যাট দিতে হবে না। টিউশন ফির মধ্যেই ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, নতুন করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়ের উদ্দেশ্যে ভ্যাট আরোপ করা হয়নি। ভ্যাটের জন্য আর টিউশন ফিও বাড়ানো যাবে না।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে সিলেট সার্কিট হাউসে প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী এ কথা বলেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, 'আমি ২৮টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কাগজপত্র ঘেঁটে দেখেছি, যারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে তাদের প্রতিদিন এক হাজার টাকা খরচ হয়। বিশ্ববিদ্যালয় বিরাট অঙ্কের বেতন পায়। সেখানে আমি মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট দাবি করছি। যারা প্রতিদিন এক হাজার টাকা খরচ করতে পারে সেখানে তারা সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট দিতে পারবে না কেন?' তিনি বলেন, 'আমরা রাজস্ব বাড়াচ্ছি, যার সুফল পুরো দেশ পাচ্ছে; কোনো গোষ্ঠী পাচ্ছে না।' তিনি বলেন,' আমাকে তো রাজস্ব আহরণ করতে হবে।'

মন্ত্রী বলেন, ভ্যাট বাবদ অর্থ পরিশোধ করার দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের, কোনো ক্রমেই শিক্ষার্থীর নয়। বিদ্যমান টিউশন ফির মধ্যে ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তাই টিউশন ফি বাড়ার কোনো সুযোগ নেই।

শাবি সম্পর্কে… : শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সংকট প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে অর্থমন্ত্রী প্রথমে এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, 'আমি আগেও বলেছি, এখনো বলছি, শাবি সম্পর্কে আমি কিছু বলব না। এখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই বিভক্ত। তাদের সাথে আমার সম্পর্ক হলো- তাদের টাকার প্রয়োজন হলে আমার কাছে যায়, আমি টাকা বরাদ্দ দিই।' মন্ত্রী বলেন, 'শিক্ষামন্ত্রী দেশের বাইরে রয়েছেন। দুই দিন পর ফিরবেন। বিষয়টি তাঁর মন্ত্রণালয়ের, তাই তিনি বিষয়টি দেখবেন। আমি তাঁর বিষয়ের মধ্যে মাথা ঢোকাতে চাই না।' 

 

আন্দোলনে পিছু হটল সরকার

যাবতীয় ফি থেকে ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে দিনভর সড়ক অবরোধ করে রাখে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফির ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে রাজধানীতে গড়ে ওঠা তুমুল আন্দোলনের মুখে পিছু হটেছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বলেছে, শিক্ষার্থীদের নয়, ভ্যাট পরিশোধের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও গতকাল একই কথা বলেছেন। এনবিআরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিদ্যমান টিউশন ফির মধ্যেই ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত করা আছে। ভ্যাটের জন্য শিক্ষার্থীদের বাড়তি টিউশন ফি দিতে হবে না। তাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের টিউশন ফি বাড়ানোরও কোনো সুযোগ নেই।01_267280

গতকাল বিকেলে সিলেটে এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, 'ভ্যাট প্রত্যাহার করার কোনো কারণ দেখছি না। একজন ছাত্র যে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, তার এভারেজ দৈনিক খরচ এক হাজার টাকা। সেখানে আমি মাত্র সাড়ে ৭ পারসেন্ট দাবি করেছি। আর এ টাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দিতে হবে। তারা যে হারে টাকা আদায় করে সে হারে এটা দিতেই পারে। তবে কোনো ফি বাড়াতে পারবে না।'

এ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে গতকাল মোবাইল ফোনেও একই তথ্য জানিয়ে সাধারণ নাগরিকদের এসএমএস দিয়েও পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনড়। যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ বিষয়ে ঘোষণা না আসবে ততক্ষণ তারা রাজপথ ছাড়বে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় টিউশন ফির ওপর ভ্যাট দিতে হবে না বলে শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেয়। কিন্তু বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রাত ৮টা পর্যন্ত কোনো ঘোষণা না দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা রাস্তায় বিক্ষোভ করছিল বলে জানা যায়।

দেশে বর্তমানে ৮৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৬৬টি মেডিক্যাল-ডেন্টাল কলেজ রয়েছে। তাতে প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। জানা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সব ধরনের ফির ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তা না মেনে আন্দোলন শুরু করে। এতে ভ্যাট ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়। কিন্তু তাও মেনে নেয়নি শিক্ষার্থীরা। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত জুলাই মাস থেকেই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সব ধরনের ফির ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আদায় শুরু করে। শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে ভ্যাট দিলেও একই সঙ্গে 'নো ভ্যাট অন এডুকেশন' স্লোগান নিয়ে আন্দোলন শুরু করে। মানববন্ধন, স্মারকলিপি পেশ, সমাবেশ, বিক্ষোভসহ নানা কর্মসূচি চালিয়ে যায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। কিন্তু সরকার তাতে কোনো কর্ণপাত করেনি। গত বুধবার রাজধানীর রামপুরা সড়ক অবরোধ করে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করলে পুলিশ লাঠিপেটা করে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পুলিশ টিয়ার শেলসহ গুলিও চালায়। এতে অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়। এরই জের ধরে রাজধানীর সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই গতকাল রাস্তায় নেমে আসে। ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে রাজধানীজুড়েই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিস্ফোরণ ঘটে।

গতকাল ধানমণ্ডির সাতমসজিদ রোডে বিক্ষোভ করে সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। স্টেট ইউনিভার্সিটি, ইউল্যাব, এশিয়া প্যাসিফিক, স্টামফোর্ড, নর্দান, ইউডা, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কয়েক হাজার শিক্ষার্থী এই বিক্ষোভে অংশ নেয়। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, 'আমার বাবা এটিএম বুথ নয়', 'ভাইয়ের বুকে গুলি কেন, জবাব চাই দিতে হবে', 'শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, অধিকার'- এ ধরনের অসংখ্য স্লোগানে মুখরিত ছিল বিক্ষোভস্থল। মাইকেও নানা ধরনের স্লোগান দিয়ে আন্দোলনরতদের উদ্বুদ্ধ করা হয়।

এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মো. ফিরোজ হাসান গতকাল দুপুরে কালের কণ্ঠকে বলেন, 'পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মাসে সর্বোচ্চ বেতন ৫০ টাকা। অথচ আমাদের দিতে হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। আমরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাইনি বলেই বেসরকারিতে ভর্তি হয়েছি। শিক্ষা ব্যয় কমাতে সরকারের উচিত ছিল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন প্রকার ফি কমানোর ব্যবস্থা করা। অথচ তা না করে উল্টো আমাদের ঘাড়েই ভ্যাটের বোঝা চাপানো হলো। আমাদের এক দফা দাবি, ভ্যাট প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত আমরা রাস্তা থেকে যাব না।'

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনালের বিবিএর শিক্ষার্থী শাহনেওয়াজ শরীফ কালের কণ্ঠকে বলেন, 'প্রতি সেমিস্টারে আমাকে প্রায় ৫০ হাজার টাকা দিতে হয়। এই টাকা চাইতেই অসহায় বাবার মুখের দিকে তাকাতে পারি না। এখন এই ভ্যাট আরোপের কারণে মাঝপথেই লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় কি না সেই দুশ্চিন্তায় আছি। তাই বাধ্য হয়েই রাস্তায় নেমে এসেছি।'

এশিয়া প্যাসিফিকের অন্য শিক্ষার্থী শাহীদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমার প্রতি সেমিস্টার ফি ৬২ হাজার টাকা। দুইবারে সেই টাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দিতে হয়। এখন সেই টাকার সঙ্গে যোগ হয়েছে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট। ফলে অতিরিক্ত প্রায় পাঁচ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে, যা আমার অভিভাবকের পক্ষে দেওয়াটা খুবই কষ্টকর।' শাহীদুলের কথার সঙ্গে সুর মিলিয়ে যোগ দিলেন স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মার্জিনা আক্তার লাভলী। তিনি বলেন, 'উচ্চশিক্ষা কি পণ্য, যে ভ্যাট দিতে হবে? আসলে সরকার শিক্ষাকে পণ্য বানানোর চেষ্টা করছে। আমরা তা হতে দেব না।'vat

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার এয়ার কমোডর (অব.) ইসফাক ইলাহী চৌধুরী গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, 'সরকারের সিদ্ধান্ত মানতেই হবে। তাই আমরা আপাতত ভ্যাট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শিক্ষার্থীদের তা জানিয়েও দেওয়া হয়েছে।'

প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম বলেন, 'আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি। এর জন্য তো সময় প্রয়োজন। পরবর্তীতে আলোচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।'

ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. আনোয়ার হাবিব কাজল  বলেন, 'এনবিআরের ব্যাখ্যাটি এসেছে শেষ বেলায়। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সবাই বের হয়ে গেছে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সময় দরকার। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পরবর্তী দিনে এ বিষয়ে মিটিং হবে।'vat

নাম প্রকাশ না করে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আসলে সরকার তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে না পেরে আমাদের ওপর চাপিয়ে দিল। এনবিআর আগে তো কখনো এমন কথা বলেনি। প্রথম থেকেই এ ব্যাখ্যা জানাত, তাহলে তো এত সমস্যা হতো না। আর ভ্যাট কনজ্যুমাররাই দেয়। এটাই নিয়ম। কিন্তু শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে নিয়মই উল্টে গেল।'

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মূল্য সংযোজন কর (মূসক) অনুবিভাগের প্রথম সচিব এবং ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক ড. মো. আব্দুর রউফ এক ব্যাখ্যায় বলেন, 'অধিকাংশ দেশই শিক্ষাসেবাকে ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখে। তবে অনেক দেশ ওই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটমুক্ত সুবিধা দেয় না, যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার নীতিমালার আলোকে শিক্ষা প্রদান করে না। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে যেসব প্রতিষ্ঠান মুনাফার উদ্দেশ্যে শিক্ষা প্রদান করে, সেসব প্রতিষ্ঠান এই সংজ্ঞার আওতায় পড়ে না। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট প্রদান করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ সিঙ্গাপুরের সব শিক্ষায়ই ৭ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। নিউজিল্যান্ডে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত শিক্ষাসেবা ভ্যাটযোগ্য সেবা। ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ। যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতেও ভ্যাট দিতে হয়। তবে আয়ারল্যান্ডে সরকারি ও বেসরকারি প্রায় সব ধরনের শিক্ষা বলতে গেলে ভ্যাটমুক্ত।'

এ জাতীয় আরও খবর