শুক্রবার, ২৩শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং ৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

দুইটি সহজ আমল

1410621886.মানুষ নেক আমল করে এবং অনেক বড় বড় নেক আমলও করে। তবে নিয়মিত আমল করার লোক খুবই কম। ফরজ-ওয়াজিব আমলগুলো তো নিয়মিতই করতে হবে। এছাড়া নফল আমল করার প্রতিও শরীয়ত উদ্বুদ্ধ করেছে। তবে সুন্নত ও নফল আমল নিয়মিত করলে ফায়দা ও বরকত বেশি অর্জিত হয়। শরীয়তে অল্প করে হলেও নিয়মিত আমলের গুরুত্ব বেশি। একদিন সারা রাত জেগে ইবাদত করলাম আর অন্যান্য রাতে ইবাদত-বন্দেগীর কোন খবরই রইল না- এটা কাম্য নয়। এরচেয়ে প্রতিদিন নিয়মিত কোন ছোট আমল করা অনেক ভালো। নিয়মিত ছোট ছোট নফল আমলের সওয়াব ও প্রতিদান এত বেশি হয় যে, আল্লাহ তাআলা এর দ্বারা বান্দার জান্নাতের ফায়সালা করেন। নিয়মিত আমলের দ্বারা অন্তরে ধীরে ধীরে নূর পয়দা হয়।
আম্মাজান হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে আমল নিয়মিত করা হয় তা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় যদিও তা অল্প হোক। বুখারী: ৫৫২৩
ইমাম গাযালী রহ. হাদীসটি বুঝানোর জন্য সুন্দর একটি উপমা পেশ করেছেন। তিনি বলেন, একটি উঁচু দালান, যার উপরে পানি পড়ার একটি পাইপ লাগানো রয়েছে। ঐ পাইপ বেয়ে অনবরত ফোঁটা ফোঁটা পানি নিচে একটি পাথরের উপর পড়ছে। এভাবে একাধারে দীর্ঘদিন পানি পড়তে থাকলে ধীরে ধীরে পাথরটি ছিদ্র হয়ে যাবে। পাথরটি যতই শক্ত ও দৃঢ় হোক না কেন নিয়মিত ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ার দরুন তা একসময় ছিদ্র হতে বাধ্য। পক্ষান্তরে কেউ যদি এ দীর্ঘ সময়ে যে পরিমাণ পানি পড়েছে তা একসঙ্গে পাথরটির উপর ঢেলে দেয়, তাহলে তা পাথরটিতে কোন ক্রিয়া করবে না, পাথরটি ছিদ্র হবে না। ফোঁটা ফোঁটা পানি নিয়মিত পড়ার প্রতিক্রিয়া এত বেশী যে, কঠিন পাথরের মত কঠিন পদার্থকেও ছিদ্র করে ফেলে। পক্ষান্তরে একবারের কয়েকশ লিটার পানি তা করতে অক্ষম।
ইমাম গাযালী রহ. বলেন, এমনিভাবে কেউ যদি অল্প অল্প করেও কোন নফল আমল নিয়মিত আদায় করে যায় তাহলে তা একদিনের বেশি আমলের চেয়ে অনেক বেশি বরকতপূর্ণ হবে। এ আমলের প্রভাব ধীরে ধীরে তার হৃদয়ের গভীরে স্থান করে নিবে। তার অন্তরে আমলের নূর পয়দা হবে, যা হঠাৎ একদিনের বেশী আমল দিয়ে আশা করা যায় না। যেমন আমরা সাধারণত দৈনিক ৩ বার খাই। যা আমাদের ক্ষুধা নিবারণের পাশাপাশি শক্তিও জোগায়। এ নিয়ম আমরা সর্বদা পালন করি। এখন কেউ যদি মনে করে অল্প অল্প তিন বেলা খাওয়ার কী  প্রয়োজন? তিন দিনের খাবার একদিনে খেয়ে নিব তাহলে এ খানা তার উপকারের পরিবর্তে ক্ষতি করবে। পেটে বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে। তাই আমলের ক্ষেত্রেও আমাদের সমতা বজায় রাখা উচিত।
ইমাম গাযালী রহ. এ ক্ষেত্রে আরেকটি উপমা পেশ করেছেন কোন সাধারণ প্রজা বাদশাহ্র সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে রাজদরবারে উপস্থিত হল। কিন্তু বাদশাহ্র সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেল না। পরের দিন আবার গেল। সেদিনও সাক্ষাতের সুযোগ পেল না। কিন্তু সে হাল ছাড়ল না। প্রতিদিনই সে বাদশাহ্র সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়ে রাজদরবারের গেটে অপেক্ষা করে। এভাবে প্রতিদিন দশ মিনিট করে সময় অপেক্ষা করলে একদিন সে অবশ্যই বাদশাহ্র সাক্ষাৎ লাভ করতে পারবে। পক্ষান্তরে এ ব্যক্তি দীর্ঘদিন যাবৎ নিয়মিত দৈনিক দশ মিনিট করে যে পরিমাণ সময় অপেক্ষা করেছে আরেক ব্যক্তি একবার এসে ততক্ষণ সময় অপেক্ষা করল। এর পর ফিরে গেল। আর এল না। তাহলে এ ব্যক্তি কি বাদশাহ্র সাক্ষাৎ লাভ করতে পারবে? কিছুতেই না।
তদ্রƒপ বান্দা নিয়মিত কোন আমলের মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে হাজির হতে থাকলে ইনশাআল্লাহ এমন একদিন আসবে যেদিন আল্লাহ তাআলা তাঁর এ বান্দার প্রতি রহমত ও দয়ার দৃষ্টি দিবেন এবং তার সকল গোনাহ ক্ষমা করে দিবেন। নিয়মিত আমলের মাধ্যমে যে জান্নাত লাভ করা যায় সে প্রসঙ্গে একটি হাদীস উল্লেখ করছি। আম্মাজান হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি দৈনিক ১২ রাকাত সুন্নতে মুআক্কাদা নিয়মিত আদায় করবে তার জন্য আল্লাহ তাআলা জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করবেন। ১২ রাকাত সুন্নতে মুআক্কাদা হল, যোহরের আগের চার রাকাত ও পরের দুই রাকাত, মাগরিবের পরের দুই রাকাত, এশার পরের দুই রাকাত এবং ফজরের আগের ২ রাকাত সুন্নত। এই ১২ রাকাত নামাজের নিয়মিত আমলের কারণে বান্দার জন্য জান্নাতের ফায়সালা হয়ে যাচ্ছে। তিরমিযী : ৪১৪
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
দু’টি আমল যদি কোন মুসলমান নিয়মিত করে তাহলে অবশ্যই সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তিরমিযী হাদীসে দু’টি আমলের কথা বলা হয়েছে। আমল দু’টি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে প— পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর এবং রাতে ঘুমানোর আগে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের পর তাসবীহে ফাতেমী তথা ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ও ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়া। মোট ১০০ বার পড়তে এক মিনিট সময় লাগতে পারে। প্রত্যেক ফরজ নামাযের পর আমরা যদি এক মিনিট করে সময় ব্যয় করি তাহলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে পাঁচ মিনিট সময় ব্যয় হবে মাত্র। মুহাদ্দিসীনে কেরাম এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, কোন ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর ১০০ বার করে মোট ৫০০ বার যদি পড়ে তাহলে আল্লাহ তাআলা তার আমল নামায় কমপক্ষে ৫০০০ সওয়াব লিখে দিবেন। কারণ, আল্লাহ তায়ালা বান্দার আমলকে কমপক্ষে দশ গুণ বৃদ্ধি করে দেন। এমনিভাবে রাতে ঘুমানোর জন্য যখন শোব তখন শুয়ে শুয়ে ঘুমানোর আগে এ তাসবীহে ফাতেমীর আমল করে নেব। তো রাতে ঘুমানোর আগে ৩৩ বার  সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ও ৩৪ বার আল্লাহু আকবার মোট ১০০ বার পড়ব। এতে কমপক্ষে দশগুণ তথা ১০০০ সওয়াব লিখা হবে। অবশ্য অপর এক বর্ণনায় ১০ বার সুবহানাল্লাহ, ১০ বার আলহামদুলিল্লাহ, ও ১০ বার আল্লাহু আকবার মোট ৩০ বার পড়ার কথা রয়েছে। এ বর্ণনা অনুযায়ী ৩০ বার পড়ার দ্বারা ৩০০ সওয়াবের অধিকারী হওয়া যাবে। 
শোয়ার পর ঘুমানোর পূর্বের এ আমলটিতে উল্লিখিত সওয়াব লাভ হওয়া ছাড়াও আরো কিছু ফায়দা ও উপকারিতা রয়েছে।
০১. যাদের ঘুমের সমাস্যা আছে। ঘুম আসতে দেরী হয়। তাদের জন্য এ আমল খুব ফলদায়ক হবে। 
বান্দা যখন শুয়ে শুয়ে যিকির শুরু করে তখন শয়তানের গায়ে আগুন জ্বলে। কারণ, এর দ্বারা বান্দা অল্প সময়ে অনেক নেকের অধিকারী হচ্ছে। তাই শয়তান যিকিরকারীর হাত-পা টিপে দ্রুত ঘুম পাড়ানোর ব্যবস্থা করবে।
০২. এভাবে তাসবীহ পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়লে ঘুমের পুরো সময়ে যিকিরের ফজিলত পাবে। কারণ, হাদীস শরীফে আছে, কেউ যদি কোন আমলে অভ্যস্ত হয় আর কোন ওযরের কারণে কখনো সে তা করতে অপারগ হলেও তাকে ঐ আমল করার সওয়াব দেয়া হবে। আমরা যখন ঘুমিয়ে পড়ি তখন আমল ও যিকির করতে অপারগ ও অক্ষম। তাই ঘুমের এ পূর্ণ সময়টা যিকির করলে যে সওয়াব পাওয়া যেত আল্লাহ তায়ালা আমার আমলনামায় সে সওয়াব লিখে দিবেন।
০৩.  এ ঘুমে তার মৃত্যু হলে কেয়ামতের দিন যিকির করতে করতে আল্লাহর দরবারে হাজির হবে।
এ সহজ আমল দু’টি এত সহজ হওয়া সত্ত্বেও তা আমরা নিয়মিত করি না। হাদীস শরীফে রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, শুনে রাখ, আমল দু’টি সহজ কিন্তু এর উপর আমলকারী লোকের সংখ্যা খুবই কম হবে।
এর কারণ হল, শয়তান মানুষের মনে ওয়াসওয়াসা ও কুমন্ত্রণা দিয়ে এ আমল থেকে দূরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে। হয়তো নামাজের মধ্যে এমন কোন কাজের কথা মনে করিয়ে দেয় যার কারণে নামাজের পর আর মসজিদে থাকা সম্ভব হয় না। এক মিনিটের এই আমলটুকু না করেই অস্থির হয়ে দ্রুত মসজিদ থেকে বেরিয়ে যায়। মসজিদে এলেই যেন আমাদের সময়ের খুব মূল্য বেড়ে যায়। দোকানে, রাস্তা-ঘাটে কিংবা বাড়ি-ঘরে অযথা কাজে বা আড্ডাবাজিতে কত দীর্ঘ সময় পার করে দেই কোন খবরই থাকে না। অথচ মসজিদে এলে কত শত কাজের কথা মনে পড়ে! কত দ্রুত বেরিয়ে যাওয়া যায় সে ফিকিরই মাথায় ঘুরপাক খায়। আর রাতে তো শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে শয়তান ঘুম পাড়িয়ে দেয়, তাই আর এ তাসবীহ পড়া হয়ে উঠে না। তাছাড়া আমলের প্রতি আমাদের উদাসীনতাও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। আমরা মূলত এ আমলগুলোর প্রতি যত্নশীল নই। আমরা পূর্ণ যত্নবান ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলে এবং আমলটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করলে ইনশাআল্লাহ তা নিয়মিত করতে পারব। 
প্রতিদিন কেউ যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের পরে ৫০০ বার এবং ঘুমানোর পূর্বে ১০০ বার মোট ৬০০ বার এ আমল করে তাহলে তার আমলনামায় দশ গুণ হিসেবে কমপক্ষে ছয় হাজার সওয়াব লিপিবদ্ধ হবে। নিয়মিত এ আমল করতে পারলে প্রতিদিন আমলনামায় ছয় হাজার করে সওয়াব যোগ হতে থাকবে। একজন মানুষ একদিনে ছয় হাজার গোনাহ করে না। এ আমলের ওসীলায় আমার আমলনামায় প্রতিদিন ছয় হাজার করে আমল যোগ হলে অবশ্যই তা আমার গোনাহের তুলনায় অনেক বেশি হবে। এভাবে আমার গোনাহের তুলনায় আমলের পাল্লা ভারি হতে থাকবে। ফলে কাল কেয়ামতের ময়দানে আল্লাহ তায়ালা আমার জন্য জান্নাতের ফায়সালা করবেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে এ সহজ আমল দু’টি নিয়মিত আদায় করার তাওফীক দান করুন।